যে গল্পের শেষ নেই

64
শেয়ার

তার বাসায় অতিথিদের নাকি আপ্যায়ন করা হয় চোলাই মদ দিয়ে! লোকে বলে, তার বাসায় নাকি পানির জগেও মদ মেলে! এলাকায় মাদক ব্যবসায় অনেকের আইডলও তিনি। কথার সত্যতা পেয়েছি কয়েকটি অভিযানেও। এই যেমন আজ। তার বাসায় আবারও পাওয়া গেল চোলাই মদ।

আটক করে থানায় এনে মামলা দেওয়া হল। অবশ্য মামলা খাওয়া তার জন্য নতুন কোন অভিজ্ঞতা নয়। তার বিরূদ্ধে এই মাদক মামলাই আছে ২১ টি।

রাঙামাটি, বান্দরবান থেকে শুরু করে সিএমপির প্রায় প্রতিটি থানার হাজতে থাকার অভিজ্ঞতা আছে তার। জেলে গেছেন ৩০ বারের বেশী। জেলে গিয়ে কিছুদিন বিরতি। এরপর আবারও নতুন উদ্যোমে শুরু। এভাবে চলতে চলতে ইতোমধ্যে চারটি মামলার রায়ে সাজাও ভোগ করেছেন। প্রতিমাসে কমপক্ষে তিনবার হাজিরা দেন আদালতে।

তারই ধারাবাহিকতায় কালও তাকে আদালতে তোলা হবে। আবারও জেলে অথবা আবারও শুরু হয়ে যাবে নতুন করে। এভাবেই চলতে থাকবে অবিরত এই প্রক্রিয়া।-ব্যস, এই হল গল্পের অসমাপ্ত শেষাংশ।

জুলেখা

অসমাপ্ত এই গল্পের মূল চরিত্র জুলেখা। বয়স ৫৮। ৫০ লিটার মদসহ তাকে আজ আটক করা হয়েছে বার্মা কলোনী থেকে।

জানি, এতটুকু পড়েই সঞ্চিত সব ক্ষোভ, রাগ, গালির ফলা ছুড়ছেন এই মহিলার দিকে। কিন্তু আগেই তো বলেছি। এটা শেষাংশ। তাই এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সমীচীন হবে না। আসুন দেখে নিই গল্পের শুরুটা।

জুলেখার বিয়ে হয় এক রোহিঙ্গার সাথে। নাম আলী। সারাদিন ঘরে শুয়ে বসেই দিন কাটাত সে। আর মানুষের বাসা বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাত জুলেখা। এভাবে তিন চার বছর কাটার পরও যখন স্বামীর কোন পরিবর্তন হয় না তখন তাকে তালাক দেয় জুলেখা। এরপর বিয়ে করে গোফরান নামে আরেকজনকে। নাম ও জাতীয়তাই পার্থক্য থাকলেও চরিত্রে কোন তফাৎ ছিল না গোফরান ও আলীর মধ্যে। আলীর মতো বেকার সেও।

সংসারের ঘানি টানতো সেই জুলেখা। শেষ পর্যন্ত গোফরানকেও তালাক দেয় জুলেখা। স্বামীর সঙ্গে যাত্রাটা এখানেই এভাবেই শেষ হয় তার। কিন্তু অকর্মণ্য এই দুই অপদার্থ যাওয়ার সময় জুলেখার কাঁধে তুলে দিয়ে যায় দুই ছেলে ও চার মেয়ের বোঝা। রাতে মাথা গোঁজার ঠাইয়ের সাথে দিনের বেলা সাতটি মুখে খাবার তুলে দিতে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছিল জুলেখা।

ঠিক সেই সময়ই তাকে ‘সহযোগিতার’ জন্য এগিয়ে আসে রহিমা (বায়েজিদ এলাকার মাদক সম্রাজ্ঞী। দুই দিন আগে থানায় আত্মসমর্পণ করে)। রহিমা তাকে প্রস্তাব দেয়, রাঙামাটি থেকে চার সেলাইন চোলাই মদ আসবে। এগুলো পার করে দিলে প্রতি সেলাইনে সে একশ টাকা করে পাবে। প্রথম চালানে সে সফল হয়। পায় ৪০০ টাকা।

এভাবে সে সপ্তাহের পাঁচদিন মানুষের বাসায় কাজ করে আর বাকি দুইদিন রহিমার কাজ করে ভালই সংসার চালাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন একটি চালান আনতে গিয়ে আটক হয় জুলেখা। রহিমার কাছ থেকে ধার নিয়ে কোনমতে জামিন নেয় সে। এরপর অনেকের কাছে গিয়ে রহিমার কাছ থেকে ধার করা টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য ধার চায়। কিন্তু সবাই তাকে ফিরিয়ে দেয়। শেষে রহিমার সাথে চুক্তি হয় পাওনা টাকার বিনিময়ে তার মদের সেলাইন চালান করে দেবে সে। পাওনা মেটানোর পর আর থাকবে না এই পথে। কিন্তু বিঁধিবাম। আবারও আটক হয় জুলেখা। আবারও সেই একই প্রক্রিয়ায় জামিন। আবারও সেই দ্বারে দ্বারে ঘুরে ফিরে আসা এবং সেই পুরনো পথে ফিরে যাওয়া। এভাবে আটক হতে হতে এক পর্যায়ে নিজেই এই ব্যবসায় নেমে পড়ে সে। কিন্তু তাতেও তার শেষ রক্ষা হয়নি।

একে একে ২১ মামলার আসামী এখন সে। জীবনের প্রতি বিরক্ত জুলেখা অনেকটা অভিমান নিয়েই বলল, ‘স্যার, এই পেশাকে আমি ঘৃণা করি। তাই আমি আমার মেয়েদের আমার কাছে রাখি না। এই পেশাতে আছি বাধ্য হয়েই। প্রতি মাসে আমার মামলা বাবদ প্রয়োজন হয় ৮ হাজার টাকা। জামিন নিতে লাগে ২৫ থেকে ৪০ হাজার। এত টাকা আমি কোথায় পাব। আমাকে তো কেউ ভাল হওয়ারই সুযোগ দিচ্ছে না। আমাকে এই পথে এনেছে রহিমা। শুনেছি সে ভাল হয়েছে। আমিও ভাল হয়ে যেতে পারব। কিন্তু আমার জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা করেন।’

জ্বি, গল্পের শুরু এটাই। শেষটা পড়ে তার প্রতি যে ঘৃণাটুকু জন্মেছিল সেটা নিশ্চয় এখন সহানুভূতিতে পাল্টে গেছে।

জীবন জীবনের নিয়মেই চলবে। আইনও চলবে তার নিজস্ব গতিতে। জুলেখাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। আদালতে তোলা হবে কাল। হতে পারে এটাই তার নতুন জীবনের প্রথম সূর্যোদয়। হতে পারে আরও গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার নতুন একটি প্রয়াস। তবে তাকে আশ্বাস দিয়েছি আলোর পথ দেখাবো বলে।

মোহাম্মদ মহসীন পিপিএম
অফিসার ইনচার্জ, বায়েজিদ বোস্তামী থানা
চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশ

মন্তব্য করুন

comments