বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদের আশ্রয় পর্যালোচনার নির্দেশ যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দণ্ডপ্রাপ্ত খুনি রাশেদ চৌধুরীর আশ্রয় মঞ্জুরের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার ঘোষণ দিয়েছে দেশটির বিচার বিভাগ। প্রায় ১৫ বছর আগে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা রাশেদের আশ্রয়ের আবেদন মঞ্জুর করে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল বিল বার ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে এই আবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে তাদের প্রতিক্রিয়া জমা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে মার্কিন সাময়িকী পলিটিকো স্থানীয় সময় শুক্রবার জানিয়েছে, রাশেদকে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় দানের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা প্রক্রিয়া শুরু করেছে দেশটির আইন বিভাগ। এ প্রক্রিয়ার শুরুর মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় হারাতে পারেন বঙ্গবন্ধুর এই খুনি।

বাংলাদেশ সরকার অনেক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে খুনি রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। সর্বশেষ গত এপ্রিলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলারের কাছে এই অনুরোধ জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন।

রাশেদ চৌধুরীর আশ্রয় পর্যালোচনার জন্য পাঠাতে গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্রের বোর্ড অব ইমিগ্রেশন আপিলস (বিআইএ)-কে চিঠি দেন অ্যাটর্নি জেনারেল বিল বার। ওই চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘আবেদনকারী যে একটি মারাত্মক অরাজনৈতিক অপরাধে জড়িত ছিল তা বিবেচনার সম্ভাব্য কোনও কারণ নেই এমনটা নির্ধারণে বোর্ড কি ভুল করেছিল?’ মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল লিখেছেন, “এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বোর্ড কি যথাযথভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল, যে অপরাধের জন্য তার অনুপস্থিতিতে আবেদনকারী দণ্ডিত হয়েছে সেই ‘অপরাধ উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না’ কিংবা ‘চরিত্রগতভাবে নৃশংস বা বর্বর ছিল না’?”

মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল বিল বারের এই পর্যালোচনা প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাশেদ চৌধুরীর আইনজীবী। ওই আইনজীবী বলেন, ২০০৫ সালে আশ্রয়ের আবেদন মঞ্জুরের সময় যদি বিল বার তার অসন্তুষ্টির কথা জানিয়ে না থাকেন তাহলে এই মামলা তার পুনরায় শুরু করার কোনও কারণ থাকতে পারে না।

রাশেদ চৌধুরীর আইনজীবী মার্ক ভ্যান ডার হাউট পলিটিকোকে বলেছেন, ‘মনে হচ্ছে বিল বার ইতোমধ্যে তার (রাশেদ চৌধুরীর) আশ্রয় মঞ্জুর করা অভিবাসন আদালতের রায় পাল্টানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। বার যদি রাশেদ চৌধুরীর পক্ষে বিচারকদের অনুসন্ধানের সঙ্গে অসম্মত না হয়ে থাকেন তাহলে এই মামলা পুনরায় শুরুর কোনও কারণ নেই।’

জানা যায়, ক্যালিফোর্নিয়ায় দুটি বাড়ির মালিক রাশেদ চৌধুরী। যার একটি কনকর্ডে এবং অন্যটি সেক্রামেন্টোতে। ২০১৫ সালে কনকর্ডে প্রায় চার লাখ ষাট হাজার ডলার দিয়ে কেনা বাড়িটির বর্তমান মূল্য প্রায় পাঁচ কোটি দশ লাখ টাকা। ওয়ালনাট ক্রিকে ২০১৬ সালে তিনি প্রায় দশ লাখ ৪০ হাজার ডলারে বাড়িটি কিনেন। যার বর্তমান মূল্য প্রায় ১১ কোটি চার লাখ টাকা।রাশেদ চৌধুরীর দুই ছেলে রূপম জে চৌধুরী এবং সুনাম এম চৌধুরী। তার দুই ছেলেও তাদের পরিবার নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকেন।

রাশেদ চৌধুরী’র বড় ছেলে রূপম চৌধুরী ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়ালনাট ক্রিকে থাকেন। তার স্ত্রী কাজল এন ইসলাম এবং তাদের দুই সন্তানকে নিয়ে সেখানে বসবাস করছেন।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে পর্যটক ভিসায় সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন রাশেদ চৌধুরী। এর দুই মাসের মধ্যেই দেশটিতে আশ্রয়ের আবেদন করেন তিন। প্রায় দশ বছর পর মার্কিন আদালতে তার আশ্রয়ের আবেদন মঞ্জুর হয়।

ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে রাশেদ চৌধুরী দাবি করেছিলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি কিছু সহকর্মীর কাছ থেকে জানতে পারেন তারা সামরিক অভ্যুত্থান করতে যাচ্ছেন। এর কিছুক্ষণ পরেই সত্যি সত্যি অভ্যুত্থান শুরু হয়ে যায়।

খুনি রাশেদের দাবি, অভ্যুত্থানের সময় তাকে প্রধান রেডিও স্টেশনের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তার নেতৃত্বাধীন দলটি স্টেশনে প্রবেশ করতেই সেখানকার নিরাপত্তাকর্মীরা স্বেচ্ছায় তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। সেই সময় অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া অন্যান্য সেনা কর্মকর্তারা বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেন।

পঁচাত্তরে পরিবারে জাতির পিতাকে হত্যার পর ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাশেদ চৌধুরী জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটে দ্বিতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। পরে তিনি কেনিয়া, মালয়েশিয়া, জাপান ও ব্রাজিলে বাংলাদেশ দূতাবাসে কাজ করেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৬ সালের জুলাইয়ে বঙ্গবন্ধুর এ খুনিকে চাকরি থেকে অব্যহতি দিয়ে দেশে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি দেশে না ফিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো চলে যান।

রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বারবার আবেদন জানিয়েছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ৫ নভেম্বর এই বিচারের কাগজপত্র চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

মন্তব্য করুন

comments