ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা না থ্যাংকলেস জব?

জামান সাহেবের পাঁচ ছেলে। প্রথম ছেলে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া বাবার ব্যবসা করে, দ্বিতীয় ছেলে জায়গা জমির দেখাশোনা, তৃতীয় ছেলে ঘরের প্রয়োজনীয় কাজ সামলায়, চতুর্থ ছেলে ভার্সিটিতে পড়ালেখা করে এবং পঞ্চম ছেলে বাক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। পরিবারের কাছে প্রথম ছেলের কদর যতটা বেশি, পঞ্চম ছেলের ঠিক ততটাই কম। এটাই স্বাভাবিক। প্রথম ছেলে জন্ম গুনে গুনান্বিত, দ্বিতীয় ছেলে জন্ম দোষে কলুষিত। এই দুটি গুণ আমরা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে যদি পারিবারিক, সামাজিক অথবা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রথম জন থেকে চতুর্থ জন পর্যন্ত পারিবারিক কাজে যে ভূমিকা রাখে, সে ক্ষেত্রে পঞ্চম জনের ভূমিকা অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু কোন একদিন কাল রাত্রিতে চুলার আগুন ঘরে লেগেছে দেখে কী করবে বুঝে উঠতে না পেরে সে আগুন কে জড়িয়ে ধরে এবং চুলার উপরে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়। আগেই বলেছি সে ছিল বুদ্ধি এবং বাক প্রতিবন্ধী। পরদিন সকালে চুলার উপরে লাশ দেখে পরিবার এবং সমাজ সবাই বলল, আহারে কি বোকা ছেলেটা। কিন্তু পরিবার বা সমাজ যাই বলুক না কেন ওই বোকা ছেলেটা কি বীরের কাজ করেছে তা শুধু সেই জানে। হয়তো পরিবার, সমাজ অথবা রাষ্ট্র বুঝতেই পারবে না ওই ছেলেটার ভূমিকা কি ছিল। বুঝতে পারারই বা দরকার কি, সে তো ছিল একটা অকর্মণ্য সমাজ রাষ্ট্র অথবা পরিবারের জন্য।

অনেক লম্বা উপক্রমণিকার জন্য দুঃখিত। এইবার আসল কথায় আসা যাক। করোনা রোধে রাষ্ট্রীয় মহাযজ্ঞে প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও আমাদের স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত সকল ব্যক্তির ভূমিকা দায়িত্ব ও কর্তব্য অন্য সকলের চেয়ে আলাদা। এই সত্য অকপটে সকলকে স্বীকার করে নিতে হবে এবং ঝুঁকিটাও উনাদের সবচেয়ে বেশি তাই উনাদের রক্ষাকবচ অন্য সকলের চেয়ে বেশী হওয়াটাই বাঞ্ছনীয় ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু সমাজে জামান সাহেবের পঞ্চম পুত্রের মত কিছু বাক প্রতিবন্ধী মানুষ রয়েছে, (আসলে বাক প্রতিবন্ধী নয়, বলার সাহস নেই) যেমন আমার মত শত শত ব্যাংক কর্মকর্তা এবং কর্মচারী। যাদের অবদানটুকু একেবারে অনস্বীকার্য নয়। হয়তোবা তারাও এই দুর্দিনে নিজের জীবন ও পরিবারের জীবন বিপন্ন হবে জেনেও বুক পেতে দেবে আর সমাজ বলবে কি দরকার ছিল তার এটা করার, দরকার তো তার ছিল না। কিন্তু তাকে দিয়ে তা করানো হয়েছে অনেকটা বাধ্যবাধকতা কোন প্রকার প্রস্তুতি ছাড়া যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতোই। তাদেরকে দেওয়া হচ্ছে না কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অথবা রাষ্ট্রীয় অথবা সামাজিক সুরক্ষা অথবা স্বীকৃতি। যাই হোক জীবন শেষে হয়তো বা কোন একটি মাধ্যমে তাকে নিয়ে একটি গল্প রচিত হবে কয়েক ফোটা চোখের জল ছেড়ে দিয়ে, অনেকে কাঁদবে, অনেকে হয়তো বা হাসবে আর যাই হোক ওই ছেলের মত তার জীবনটা একেবারে অনালোচিত হয়ে থাকবে না এটাই পরম পাওয়া।

মিজানুর রহমান, ব্যাংক কর্মকর্তা

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। চাটগাঁ পোর্টাল-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য চাঁটগা পোর্টাল কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।*

মন্তব্য করুন

comments