নমুনাজট, আইসিইউ ও চিকিৎসক সংকটে নাজেহাল চট্টগ্রাম

মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে চট্টগ্রামে লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে করোনা রোগীর সংখ্যা। চট্টগ্রামে ৪ জুন পর্যন্ত ৩ হাজার ৬৬৯ জনের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। যেখানে, ৩ মে রোগির সংখ্যা ছিল মাত্র ৮৬ জন।

হঠাৎ বেড়ে যাওয়া রোগী সামাল দিতে রীতিমতো নাজেহাল চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা। নানামুখি সমস্যায় জর্জরিত চট্টগ্রাম। নমুনাজট, চিকিৎসক সংকট, অক্সিজেনের অভাব এসবের সাথে যুক্ত হয়েছে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় ঔষধের সংকট।

মে মাসের শুরু থেকেই চট্টগ্রামে মূলতঃ করোনা পরীক্ষার নমুনাজট দেখা দিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সন্দেহভাজন রোগীর পাশাপাশি বেড়েছে নমুনা সংগ্রহ। প্রতিদিন গড়ে ৬০০ থেকে ৮০০ নমুনা আসছে চট্টগ্রামের ৩ টি ল্যাবে।

অথচ, ফৌজদারহাটের বিশেষায়িত ল্যাব বিআইটিআইডি ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) ল্যাবে সক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ পরীক্ষা করার পরেও চট্টগ্রামে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ এর বেশী নমুনা পরীক্ষা করা যাচ্ছেনা। যার কারনে, এই দুটি ল্যাবেই জমা পড়ে আছে প্রায় ২০০০ এর বেশী নমুনা।

আশা ছিল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা শুরু হলে এই জটের সমাধান কিছুটা হলেও হবে। কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ কিটের কারণে পিছিয়ে গেছে সেখানকার নমুনা পরীক্ষাও। তাই চট্টগ্রামের নমুনাজটের সমাধানের পথ শীঘ্রই আর কাটছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, চট্টগ্রামে আইসিইউ সংকটে ঝুঁকিপূর্ণ রোগী আর স্বজনদের হাহাকার চলছেই। চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোতে গড়ে ২শ’ জন করোনা আক্রান্ত রোগী নতুন করে যুক্ত হচ্ছে। যার মধ্যে অন্তত ২৫ জন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ভর্তি হচ্ছেন। এরমধ্যে চিকিৎসক’ও রয়েছেন।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সূত্রমতে, চট্টগ্রামে ভ্যান্টিলেটরসহ আইসিইউ প্রস্তুত আছে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ১০টি ও হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতাল ১০টি। 

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত এক হাজারের বেশি রোগী এখন চিকিৎসাধীন রয়েছেন নগরীর বিশেষায়িত চারটি হাসপাতালে। কিন্তু জেনারেল হাসপাতালের ১০টি শয্যা ছাড়া আর কোনো আইসিইউ’র ব্যবস্থা করা যায়নি।

চট্টগ্রাম বিএমএ সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. মইজ্জুল আকবর চৌধুরী বলেন, ‘সমগ্র চট্টগ্রামের জন্য ২০টি আইসিইউ বেড এটা নামমাত্র ছাড়া কিছুই না। সাধারণ মানুষের চাহিদার কাছে এটা কখনও পর্যাপ্ত নয়।’

শুধু করোনা আক্রান্ত রোগীরা অক্সিজেন কিংবা আইসিইউ সংকটে ভুগছেন, তা নয়। স্বাভাবিক শ্বাসকষ্টের রোগীরাও প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে এই সুবিধা পাচ্ছে না।

এ অবস্থায় অতি দ্রুত অন্তত ৬০টি আইসিইউ শয্যার ব্যবস্থা করা না গেলে বিপর্যয় নেমে আসার আশংকা করছেন চিকিৎসকরা।

সবচেয়ে আশংকার বিষয় হলো, চট্টগ্রামে চিকিৎসকসহ জনবল কম থাকায় চিকিৎসা সেবাও ব্যাহত হচ্ছে। সমন্বয়হীতার কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক না পাওয়ায় সরকারের অধিগ্রহণ করা বেশ কিছু হাসপাতালেও চিকিৎসা সেবা চালু করা যাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আবদুর রব বলেন, আমাদের বিভিন্ন গ্রুপে কাজ করতে হচ্ছে। এক সাথে কাজ করতে পারছি না। জনবল কম থাকায় সমস্যা হচ্ছে।

বিএমএ এর চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী বলেন, ৩০ জন চিকিৎসক দিয়েছেন। তার মধ্যে ১২ জন গর্ভবতী। তাদের দিয়ে তো করোনা চিকিৎসা করানো যাবে না।

চট্টগ্রামে এই মূহুর্তে সাথে ৮৩ জন চিকিৎসক করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। আর করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২ জন। এছাড়া করোনার উপসর্গ নিয়েও এক চিকিৎসক মারা গেছেন।

বিশিষ্টজনরা চরম উদ্বেগের সাথে বলেছেন, চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্ত প্রায় ৩৫০০ রোগির বিপরীতে হাসপাতালে বেড আছে মাত্র ৩১০ টি। এ অবস্থায় চট্টগ্রামের হলিক্রিসেন্ট হাসপাতাল, ইম্পেরিয়াল হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালগুলো অতি দ্রুত করোনা চিকিৎসার উপযোগী করে তুলতে হবে।

অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় ঔষধ সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষার ব্যবস্থা করারও দাবী জানান তারা।

মন্তব্য করুন

comments