চট্টগ্রামে চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু বাড়ছে

করোনা সন্দেহে রোগী ফিরিয়ে দেওয়ার কারণে চট্টগ্রামে চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। গত ৩ দিনে এরকম অন্ততঃ ৬ টি অভিযোগ এসেছে গণমাধ্যমে। এধরণের অভিযোগে বেসরকারি হাসপাতালগুলো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা থাকলেও কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। 

বুধবার (১০ জুন) ৫ হাসপাতাল ঘুরে আইসিইউ না পেয়ে মারা গেলেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি লায়ন মো. কামাল উদ্দিন। এছাড়া শয্যা খালি নেই বলে ফিরিয়ে দেওয়ার পর জসিম উদ্দিন চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি গাড়িতেই মারা গেছেন।

এর আগে গতকাল বুধবার দিবাগত মধ্যরাতে করোনা উপসর্গ নিয়ে কামাল উদ্দিনকে মা ও শিশু হাসপাতালে নেয়া হয়। শ্বাসকষ্ট থাকায় তাকে অক্মিজেন দেয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু দুই ঘন্টায়ও সেখানে অক্সিজেন পাওয়া যায়নি বলে পরিবারের অভিযোগ।

এরপর কামাল একে একে পার্কভিউ হাসপাতাল, ম্যাক্স হাসপাতাল ও মেট্রোপলিটন হাসপাতালে নেয়া হয়; কিন্তু কোথাও করোনা সন্দেহে ভর্তি করা হয়নি বলে দাবি কামালের স্বজনদের।

এরপর ট্রিটমেন্ট হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু সেখানে আইসিইউ খালি ছিল না, একপর্যায়ে বৃহস্পতিবার ভোররাতে মারা যান তিনি।

মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চারটি হাসপাতাল ঘুরে কামাল উদ্দিনকে ট্রিটমেন্ট হাসপাতালে যখন আনা হয় তখন তার অক্সিজেন নেমে গিয়েছিলো ৭৮-এ। সে সময় হাসপাতালে তিনটি আইসিইউ শয্যার মধ্যে তিনটিতেই রোগী ভর্তি ছিল। খোঁজ নিয়ে অন্য কোথাও আইসিইউ মেলেনি। আইসিইউর অভাবে তিনি মারা যান।

এর আগে তাকে নগরের বেসরকারি ন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়া হলেও ফ্লু কর্নার শয্যা খালি নেই উল্লেখ করে জসিম উদ্দিন চৌধুরীকে (৬০) ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রোগী মারা গেছেন।

তার ছেলে জোবায়ের উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বাবার শারীরিক অবস্থা অবনতি হওয়ার পর প্রথমে ন্যাশনাল হাসপাতালে যোগাযোগ করি। তারা রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে। এরপর হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর কোনো চিকিৎসক এগিয়ে আসেননি। হাসপাতালে এক কর্মচারী আমার বাবার অক্সিজেন মেপে দেখেন। এরপর তারা জানায়, রোগীর অক্সিজেন সাপোর্ট প্রয়োজন। কিন্তু তাদের হাসপাতালে ফ্লু কর্নারে শয্যা খালি নেই। ভর্তি নিতে পারবে না। 

তিনি আরও বলেন, এরপর উপায় না পেয়ে বাবাকে নিয়ে চমেক হাসপাতালের দিকে রওনা হই। কিন্তু গাড়িতেই বাবা নিস্তেজ হয়ে পড়েন। পরে জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে দেখে জানান, রোগী আরও আগে মারা গেছেন।

এর আগে মঙ্গলবার (৯ জুন) সকালে নগরীর তিনটি হাসপাতালে ঘুরে চিকিৎসা না পেয়ে মারা যান নগরের বায়োজিদ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম ছগির।

জানা গেছে, বুকে হঠাৎ ব্যথা ওঠার পরপরই প্রথমে তাকে নেওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে ভর্তি হতে না পেরে এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় জিইসি এলাকার বেসরকারি মেডিকেল সেন্টারে। সেখান থেকেও ফিরিয়ে দেওয়ার পর গেলেন পাঁচলাইশের পার্কভিউ হাসপাতালে। সেখানেও একই চিত্র। এরপর বিভিন্নভাবে তদবির করে পার্কভিউতেই ভর্তি করানোর অল্পক্ষণের মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ৫৯ বছর বয়সী শফিউল আলম ছগির।

এমন মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছিলেন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। তিনি বলেন, সঠিক সময়ে চিকিৎসা পেলে তিনি বেঁচে থাকতেন। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর এ ধরনের অমানবিকতা সহ্য করা হবে না।

মেয়র আরো বলেন, এ সভা শেষ সভা। আর কোনো অনুরোধ হবে না। এবার অ্যাকশন শুরু হবে। যদি কোনো রোগী বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে মারা যায় বা আপনারা চিকিৎসা না দেন তবে এর পরিণাম ভালো হবে না।

এছাড়া গতকাল বুধবার আইয়ুব আলী নামে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক রোগীকে রাঙ্গুনিয়া থেকে আনা হয় নগরীতে। বেসরকারি মেডিকেল সেন্টার, মেট্রোপলিটন হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে নিয়েও তাকে ভর্তিতে ব্যর্থ হন স্বজনরা। অবশেষে দুপুরে তাকে নিয়ে যান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে নেয়ার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায় আইয়ুব আলী আর নেই।

প্রায় একই সময়ে রাঙ্গুনিয়া থেকে আনা হয় শ্বাসকষ্টের আরেক রোগীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আনার পরই তার মৃত্যু হয়। ওই রোগীর এক স্বজন অভিযোগ করে বলেন, মৃত ফজলুল কাদের চৌধুরী তার বোনের জামাই। বেশ কয়েকদিন ধরে তার জ্বর ও সর্দিকাশি ছিল। ভালো না হওয়ায় মঙ্গলবার রাঙ্গুনিয়ায় অবস্থিত বেসরকারি ন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভর্তি না নেয়ায় বাড়িতে নিয়ে যান। বুধবার সকালে আবার রাঙ্গুনিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলে সেখান থেকে চমেক হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়। দুপুরে চমেক হাসপাতালে তিনি মারা যান।

বেসরকারি হাসপাতাল তদারকির জন্য গঠিত সার্ভিলেন্স টিমের প্রধান চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মিজানুর রহমান বলেন, ‘নগরীর অধিকাংশ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজেদের কাছে আইসিইউ বেড খালি নেই, ভেন্টিলেটর নেই, অক্সিজেন নেই, চিকিৎসক সংকট রয়েছে- এ ধরনের অজুহাত দিচ্ছে। কিন্তু সোমবার আমরা নগরীর ১৬টি বেসরকারি হাসপাতালে ৮৪টি শয্যা খালি থাকার চিত্র পেয়েছি। এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

উল্লেখ্য, বৃহত্তর চট্টগ্রামের প্রায় দেড় কোটি মানুষের জন্য কোভিড ডেডিকেটেড আইসিইউ আছে মাত্র ১০ টি। 

মন্তব্য করুন

comments