চট্টগ্রামের ‘ক্লাস্টার জোন’ পাহাড়তলী-সাগরিকা!

দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে। চট্টগ্রামেও প্রতিদিনই করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরিধি বাড়ছে। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে সামাজিক সংক্রমণ। নগরীর পাহাড়তলি-সাগরিকা এলাকায়ই কেন্দ্র বা ‘ক্লাস্টার জোন’ হয়ে উঠছে বলে সন্দেহ করছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডিতে গত ১৯ দিন করোনাভাইরাস পরীক্ষায় চট্টগ্রাম জেলার মোট ১৬ এই রোগ ধরা পড়েছে। এদের মধ্যে অধিকাংশেরই বিদেশফেরত বা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নগর ও জেলায় শিশুসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস। গত ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার, ১৩ এপ্রিল) চট্টগ্রামে শনাক্ত হওয়া দুই করোনা রোগীর একজন নগরের পাহাড়তলী থানার সড়াইপাড়া ও অপরজন ওই থানার কাট্টলী এলাকার এলাকার বাসিন্দা। এদের মধ্যে সড়াইপাড়া এলাকায় করোনা আক্রান্ত নারী (৫০) দুপুরে আইশোলসনে থাকা অবস্থায় মারা গেছেন।

আরো পড়ুনঃ

চট্টগ্রামে নতুন আক্রান্ত ১১, মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২৭

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত সাতদিনে চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের অবস্থান যাচাই করে দেখা গেছে, তাদের আটজনই নগরের পাহাড়তলী থানা ও আশপাশের বাসিন্দা।

১৪ই এপ্রিল (মঙ্গলবার) পর্যন্ত পাহাড়তলী-সাগরিকা-দঃ কাট্টলি-উঃ কাট্টলি এলাকায় যে ৮ জন করোনা রোগী পাওয়া গেছেঃ

  • পাহাড়তলী থানার সাগরিকা এলাকায় – ১ জন (৮ এপ্রিল সনাক্ত)
  • পাহাড়তলী থানার শাপলা আবাসিকে – ১ জন (৮ এপ্রিল সনাক্ত)
  • পাহাড়তলীর পাশের থানা আকবর শাহ থানার ইস্পাহানী গেট এলাকায় – ১ জন (১০ এপ্রিল সনাক্ত)
  • পাহাড়তলী থানার সিডিএ মার্কেট এলাকার দুলালাবাদ এলাকায় – ১ জন (১১ এপ্রিল সনাক্ত)
  • পাহাড়লীর পাশের উপজেলা সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট এলাকায় – ১ জন (১২ এপ্রিল সনাক্ত)
  • পাহাড়তলী থানার উত্তর কাট্টলী এলাকায় – ১ জন (১৩ এপ্রিল সনাক্ত)
  • পাহাড়তলী থানার সড়াইপাড়া এলাকায় – ১ জন (১৩ এপ্রিল মারা গেছেন)

এছাড়া গত ৯ এপ্রিল এক গার্মেন্ট কারখানা কর্মকর্তার শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার ঘটনায় ব্যাংক এশিয়ার আন্দরকিল্লা শাখা লকডাউন করে সব কর্মকর্তাকে কোয়ারেন্টিনে থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়। আক্রান্ত ওই ব্যক্তি উত্তর কাট্টলী এলাকার একটি পোশাক কারখানার অ্যাসিস্ট্যান্ট কমার্শিয়াল অফিসার। ৫ সহকর্মীকে হোম কোয়ারেন্টিনে আছেন।

এ কারণে চীনের উহান ও নারায়ণগঞ্জের মতোই বন্দরনগরীর প্রবেশমুখের ওই এলাকাটিকে চট্টগ্রামে করোনার ‘ক্লাস্টার জোন’ মনে করছে স্বাস্থ্য বিভাগ। সে কারণে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, চট্টগ্রামে ‘আংশিক’ কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়েছে। তবে তা ধীর গতিতে।

তিনটি কাছাকাছি এলাকায় করোনা সংক্রমণে আশঙ্কা প্রকাশ করে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক হাসান শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘পাহাড়তলী-কাট্টলী-সাগরিকা এলাকায় করোনা ক্লাস্টার গ্রো করছে বলে ধারণা করছি। তবে সেটা আরও কয়েক দিন দেখতে হবে। যদি এটা হয়ও এর প্রভাব জানতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। যে সবজি বিক্রেতা আক্রান্ত তিনি ভ্যানগাড়িতে করে সবজি নিয়ে বিভিন্ন স্থানে গিয়েছিলেন। তিনি কিভাবে আক্রান্ত হলেন তার কোনো লিংক পাওয়া যায়নি। আমাদের ধারণা, ওই এলাকায় মানুষের জটলা থেকে ট্রান্সমিশন হয়ে থাকতে পারে। আরও তিনদিন দেখে প্রয়োজনে ওই এলাকা বন্ধ করে দেওয়া হবে’।

এ কারণে সংক্রমণ ঠেকাতে নগরীর কাঁচাবাজার, মসজিদ ও পাড়া-মহল্লায় জনসমাগম একদমই কমিয়ে আনতে এবং ব্যাংকগুলোতে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।

ইতোমধ্যে পাহাড়তলী এলাকায় পাঁচটি ভবন, হালিশহর শাপলা আবাসিক এলাকায় ৬ পরিবারের ১টি বাড়ী, সাগরিকা রোডের একটি বাড়ি, আকবরশাহ থানার ইস্পাহানি চত্ত্বরের দুটি সেমিপাকা ঘর, সরাইপাড়ায় ১টি বাড়ি এবং উত্তর কাট্টলীর এগারো পরিবারকে লকডাউন করা হয়েছে।

ক্লাস্টার ট্রান্সমিশন কি সেটা বোঝাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ‘একটি পরিবার এবং এর আশেপাশের বর্ধিত বৃত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ লোকালয়ে সংক্রমিত হলে তাকে ক্লাস্টার ট্রান্সমিশন বলা হয়। আর কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হচ্ছে—যদি কোনও আক্রান্ত রোগী কোথা থেকে আক্রান্ত হলো, তা খুঁজে না পাওয়া যায়, বা কোনও তথ্য না পাওয়া যায়।’

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘যদি কোথাও একই জায়গায় কম দূরত্বের মধ্যে একাধিক রোগী থাকে, তখন ওই জায়গাকে ক্লাস্টার হিসেবে চিহ্নিত করে অনুসন্ধান করা হয়।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই দেশের করোনা ক্লাস্টারগুলো চিহ্নিত করে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা বাস্তবায়ন করা না গেলে পরবর্তীতে কারোর পক্ষেই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।

মন্তব্য করুন

comments