অনলাইন গেম ‘ব্লু হোয়েল’; আত্মহত্যা প্ররোচনাকারী এক মরণফাঁদ! সম্প্রতি এই গেম নিষিদ্ধ করছে ভারত সরকার

194
শেয়ার
ছবিঃ সংগৃহিত

ব্লু হোয়েল মানে নীল তিমি। আপাত নিরীহ দুটি শব্দের পিছনে লুকিয়ে মরণ নেশা। আত্মঘাতী নেশা। তরুণ প্রজন্মের কাছে অনলাইনে গেম খেলা এক ধরণের নেশার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ল্যাশ অফ ক্ল্যান, লীগ অফ লেজেন্ডস কিংবা মিনি মিলিশিয়ার মতো গেমের মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকা তরুণ-তরুণীর সংখ্যা নেহাতই কম না।

নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী ইচ্ছামতো গেম ডাউনলোড করে বা অনলাইনে থেকেই খেলা যায়। তবে অনলাইন গেম ‘ব্লু হোয়েল’ যেন একটি মরণ নেশা। এই নেশার জাল ছড়িয়েছে রাশিয়া, ইউরোপ হয়ে ভারত পর্যন্ত।

বিশ্বে এখন নয়া আতঙ্ক অনলাইন গেম ‘ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জার’। এই গেমে থাকে মোট ৫০টি চ্যালেঞ্জ। প্রথমে ভোর ৪টায় উঠে কোনও ভয়ের সিনেমা দেখতে হবে। এরপর হাত কেটে ছবি আঁকা-সহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে শেষপর্যন্ত ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা।

সম্প্রতি জানা গেছে, রাশিয়া থেকে ছড়িয়ে পড়া এ গেমসটি ইউরোপজুড়ে আতংক সৃষ্টি করেছে। ইতিমধ্যে প্রায় ১৫০ অল্প বয়স্ক ছেলেমেয়ে ও তরুণ তরুণী আত্মহত্যা করেছে এ গেমস খেলতে গিয়ে।

গত শনিবার (১২ আগস্ট) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদেনীপুরের আনন্দপুর থানা এলাকায় নিজের বাড়ির বাথরুমে মুখে প্ল্যাস্টিকের প্যাকেট জড়ানো অবস্থায় অঙ্কন দে নামক এক কিশোরের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য দাবি করে যে, এই গেমসের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।

গত মাসে এই প্রাণঘাতী গেমটি খেলতে গিয়ে বহুতল থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মঘাতী হয়েছে মুম্বাইয়ের আন্ধেরির বাসিন্দা চোদ্দো বছরের এক কিশোর। নীল তিমির খপ্পরে পড়েছিল পুণে ও ইন্দোরের দুই কিশোরও। আত্মঘাতী হওয়া থেকে কোনওরকমে রক্ষা করা গিয়েছিল তাদের।

এছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একাধিক দুর্ঘটনা এবং আত্মহত্যার ঘটনায় নাম জড়িয়েছে ‘ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেম’ নামের এই সোশ্যাল গেমিং-এর। এক পরিসংখ্যানগত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে, গত তিন মাসে রাশিয়া এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় মোট ১৬ জন তরুণী আত্মহত্যা করেছেন।

এতো কম সময়ের মধ্যে এত জন অল্পবয়সী মেয়ের আত্মহত্যার ঘটনা বিস্মিত করেছিল পুলিশকেও। এদের মধ্যে সাইবেরিয়ার দুই স্কুলছাত্রী য়ুলিয়া কনস্তান্তিনোভা (১৫) এবং ভেরোনিকা ভলকোভা (১৪) একটি বহুতলের ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে বলে পুলিশ রিপোর্ট থেকে জানা যায়। তদন্তকারী অফিসারদের তখন মনে হয়েছিল, এই সমস্ত আত্মহনন হয়তো বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়, হয়তো কোনও গোপন যোগসূত্র রয়েছে এদের মধ্যে। মৃত্যুর পূর্বে য়ুলিয়া তার সোশ্যাল পেইজে একটি তিমির ছবি পোস্ট করে লিখে যায় ‘সমাপ্ত’।

তদন্তে নেমে পুলিশের নজরে আসে এই ‘ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেম’। পুলিশ আরো ধারণা করতে থাকে সারা বিশ্বে অন্তত ১৫০ জন মানুষের আত্মহননের জন্য পরোক্ষে দায়ী এই অনলাইন গেইম।

কি আছে ‘ব্লু হোয়েল’ গেমস এ?

ছবিঃ সংগৃহিত

এই খেলায় মোট ৫০টি আত্মনির্যাতনমূলক পর্যায় সম্পন্ন করতে হতো গেমে প্রতিযোগীদের। অদ্ভুত ও ভয়ঙ্কর ছিল সেই সমস্ত পর্যায়। প্রতিটি পর্যায়ের বিভিন্ন টাস্ক ছিল বেশ ভয়ঙ্কর। গেমের শুরুর টাস্কগুলি অবশ্য তেমন আহামরি কিছু নয়। বরং বেশ মজারই। যেমন, হঠাৎ মাঝরাত্রে ঘুম থেকে উঠে ভূতের সিনেমা দেখা। আর সেইজন্যই খুব সহজেই এই অনলাইন গেমের প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হতে থাকে কিশোর-কিশোরীরা।

গেম যত এগোবে, টাস্ক তত ভয়ঙ্কর হতে থাকবে। প্রথমদিকের টাস্কগুলি মজার হওয়ায় সহজেই আকৃষ্ট হয়ে পড়ে কিশোর-কিশোরীরা। কেউ খেলায় ইচ্ছুক হলে তার কাছে পৌছে যায় নির্দেশাবলি। সেইমতো নির্দেশ বা চ্যালেঞ্জগুলি একে একে পূরণ করে তার ছবি পাঠাতে হয় গেম হ্যান্ডলারকে। নিজের হাত কেটে তিমির ছবি এঁকে ছবি তুলে পাঠাতে হয়। এই খেলায় অংশগ্রহণকারীকে হোয়েল বলা হয়। স্বেচ্ছায় তারা এই মারণ খেলায় যোগ দেয়।

অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের দেওয়া টাস্ক করে এবং ছবি পাঠায়। গেমের শেষে এদেরই আত্মহত্যা করতে বলা হয়। এই খেলার জন্ম রাশিয়ায়। জন্মদাতা ২২ বছরের তরুণ ফিলিপ বুদেকিন। ২০১৩ সালে রাশিয়ায় প্রথম সূত্রপাত। ২০১৫ সালে প্রথম আত্মহত্যার খবর পাওয়া যায়। বুদেকিনের দাবি, সমাজ সাফাই করতেই এই গেম ছড়িয়েছে সে। ১৬জন কিশোরীকে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ ওঠে ফিলিপের বিরুদ্ধে।

রাশিয়া থেকে এ গেমসের মূল হোতা ফিলিপ বুদেকিনকে গ্রেফতার করাও হয় মাস দুয়েক আগে। কিন্তু তার আগেই পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায়ও ছড়িয়ে পড়ে এ গেমসটি।

মারাত্মক এই গেমটি ইন্টারনেট থেকে মুছে ফেলতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। গেমের লিঙ্কটি মুছে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে মোদি সরকার।।

গত বুধবার ভারতের কেরালার ২২ বছর বয়সী এক ছেলে গলায় ফাঁসি নিয়ে আত্মহত্যা করেন। তার পরিবার দাবি করছে, সে ব্লু হোয়েল গেমে আসক্ত ছিল। আর তার মৃত্যুর জন্য ওই গেমকেই দায়ী করছেন তারা।

গুগল, ফেসবুক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এই গেমের যাবতীয় লিঙ্ক সড়িয়ে দিতে দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছে। এই গেম নির্মাণের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

মন্তব্য করুন

comments