মহাকাশের প্রাণহীন বাসিন্দারা ও সৃষ্টির বৈচিত্র্য

39
শেয়ার
গ্রহাণুঃ

গ্রহাণু

গ্রহাণু মূলত সূর্যের চারপাশে ঘুর্ণনরত পাথরখন্ড বা লৌহখন্ড। মঙ্গল ও বৃহস্পতির আবর্তন পথের মাঝামাঝি ডোনাটের মত একটি এলাকায় এদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বিজ্ঞানীরা মনে করেন বৃহস্পতি গ্রহের দুর্বার আকর্ষনে গ্রহাণুগুলো নিজেরা মিলিত হয়ে আরেকটি গ্রহে পরিণত হতে পারে নি। সবচেয়ে বড় গ্রহাণুটির আকার প্রায় ৯৪০ কিলোমিটার হিসেব করা হয়েছে।
পৃথিবী থেকে ২৮ মিলিয়ন মাইল দূরে অবস্থানকারী গ্রহাণুগুলোই মূলত বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত। এরা অনেক সময় পৃথিবীর কক্ষপথ অতিক্রম করে। ফলে অনেক সময় সংঘর্ষের সম্ভাবনা থাকে। তাই অনেক কম্পিউটার প্রোগ্রাম এদের চিহ্নিতকরন ও সতর্ককরনের কাজে নিয়োজিত।

অরোরাঃ

অরোরা

অরোরা হচ্ছে উত্তর ও দক্ষিন মেরুতে দেখা যাওয়া রঙিন আলোর প্রদর্শনী। আমেরিকার আলাস্কায় ও অন্যান্য উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে অরোরা দেখা যায়। বছরে প্রায় ২৫ বার এদের দেখা যায় সেখানে। অরোরা সাধারনত সাদা বা সবুজাভ হয় তবে হলুদাভ বা লালচে আভাও নিতে পারে। সূর্যের কালো রেখা(ফ্রণহফার) থেকে আসা চার্জিত কণা ও সোলার ফ্লেয়ার(flair) যখন ভূ-পৃষ্ঠের উপরের স্তরের হাল্কা গ্যাসকে উত্তেজিত করে, তখন অরোরা দেখা যায়। আসলে গ্যাসগুলো অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন।

এদের সাথে যখন চার্জিত কণার সংঘর্ষ হয় এরা ইলেক্ট্রন ছাড়ে আয়নে পরিণত হয়,এই ইলেক্ট্রন যাবার সময় রেডিয়েশন ছাড়ে। এটিই অরোরা হিসাবে আমরা দেখি। সাধারনত শীতকালে অরোরা কম দেখা যায়। এখন প্রশ্ন হল, কেন শুধু মেরু অঞ্চলেই এটা দেখা যায়? পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র সূর্যের কালো রেখা থেকে আসা চার্জিত কণাকে বিচ্যুত করে মেরু অঞ্চলে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের দুই মেরুতে নিয়ে আসে।

ব্ল্যাক হোলঃ

ব্ল্যাক হোল

মহাবিশ্বের সবচাইতে রহস্যময় বস্তু হল ব্ল্যাক হোল।

মহাবিশ্বের কিছু স্থান আছে যা এমন শক্তিশালী মহাকর্ষ বল তৈরি করে যে এটি তার কাছাকাছি চলে আসা যেকোন বস্তুকে একেবারে টেনে নিয়ে যায়, হোক তা কোন গ্রহ, ধুমকেতু বা স্পেসক্রাফট, তাই ব্ল্যাক হোল। পদার্থবিজ্ঞানী জন হুইলার এর নাম দেন ব্ল্যাক হোল। কেন? কারন ব্ল্যাক হোলের মহাকর্ষ বল এতই বেশি যে এর আকর্ষন থেকে এমনকি আলোও(ফোটন) বের হয়ে আসতে পারে না। ১৯১৬ সালে আইনস্টাইন তার জেনারেল রিলেটিভিটি তত্ত দিয়ে ধারনা করেন ব্ল্যাক হোল থাকা সম্ভব।

আর মাত্র ১৯৯৪ সালে এসে নভোচারিরা প্রমাণ করেন আসলেই ব্ল্যাক হোল আছে। এটি কোন সাইন্স ফিকশন নয়। জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল শোয়ার্জস্কাইল্ড ১৯১৬ সালেই দেখান যেকোন তারকা ব্ল্যাক হোলে পরিণত হতে পারে। সূর্যের ব্যাসার্ধ (৮৬৪,৯৫০মাইল) যদি কমতে কমতে সঙ্কুচিত হয়ে ১.৯ মাইলে পরিণত হয় তাহলে সূর্যও ব্ল্যাক হোলে পরিণত হবে। তিনি ঘটনা দিগন্তের ব্যাসার্ধ মাপতে সক্ষম হন। ঘটনা দিগন্ত হল কোন এলাকা ব্যাপী ব্ল্যাক হোলের প্রভাব থাকবে সেই এলাকার ব্যাসার্ধ। বিজ্ঞানীরা প্রথম Cygnus X-1 নামক তারকারাজি থেকে মাত্রাতিরিক্ত এক্সরে রেডিয়েশন বেরুচ্ছে খেয়াল করেন। ১৯৭১ সালে বিশ্বের প্রথম এক্সরে স্যাটেলাইট এই এক্সরে রেডিয়েশনের মূল সূত্র বের করে হতবাক হয়ে দেখেন এটা একটা অতি বৃহৎ কিন্তু অদৃশ্য বস্তু থেকে আসছে।

ব্ল্যাক হোলের একটা বিশেষত্ব হচ্ছে এর চারপাশে যখন আকর্ষিত গ্যালাক্সি এসে পড়ে তখন এটি গ্যালাক্সি বা যেকোন মহাজাগতিক বস্তুকে স্পাইরাল একটা ওয়ে(WAY) তে শুষে নিতে থাকে। এটা অনেকটা এমন যে একটা টেবিলের মাঝখানে ফুটো করে সেই ফুটোটা যদি টেবিলের লেভেল থেকে একটু নিচে থাকে তাহলে একটা বল টেবিলে ছেড়ে দিলে তা ঘুরতে ঘুরতে সেই ফুটোতে পতিত হবে একসময়।

ব্লাক হোল আসলে মৃত তারকা। তারকা মানে হল উজ্জ্বল নক্ষত্র। যাদের আলো আছে। যেমন – সূর্য। ভারতের অসাধারন মেধাসম্পন্ন বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর সুব্রাহ্মন কোন তারা ব্লাক হোল হতে পারে তার একটা সীমা ঠিক করে দিয়েছেন। তা হল সুর্যের ভরের ১.৫ ভাগ বেশি ভরের সব তারা নিজেদের জ্বালানী শেষ হয়ে গেলে নিজেদের ভরে নিজেরাই সঙ্কুচিত হয়ে সসীম আয়তন কিন্তু অসীম ঘনত্বের ব্ল্যাক হোলে পরিণত হবে। বাকিরা পালসার বা নিউট্রন তারকা হবে।

ধুমকেতুঃ

ধুমকেতু

ধুমকেতু হল ছোট গ্রহাণু যেগুলো সূর্যের কাছাকাছি এলে ধোঁয়াশা মেঘ ধুলির সৃষ্টি করে। এরা অনেকসময় লম্বা উজ্জ্বল লেজের সৃষ্টি করে। সূর্যের কাছ দিয়ে যাবার সময় টেলিস্কোপের মাধ্যমে এদের দেখা যায়। তবে ১৯১০ সালে The great comet কে পৃথিবী থেকেই দেখা যায়। সেকি লাইন, ইকইয়া সেকি, এরেন্ড রোল্যান্ড, ওয়েস্ট, হায়াকু টাকে, হেইল বুপ, হ্যালির ধুমকেতু, স্কেজেলারাপ-মারিস্টানি ইত্যাদি কয়েকটি ধুমকেতু।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন ধুমকেতু ইটের ব্লকের মত কাজ করে করে ৪.৬ বিলিওন বছর আগে ইউরেনাস ও নেপচুনকে তৈরি করেছে। ধুমকেতু যখন সুর্যের থেকে দূরে থাকে এতে কোন পরিবর্তন হয়না। এর মানে বুঝতে পারছেন? এর মানে বিজ্ঞানীরাও বলেছেন; যে ধুমকেতুতে অনেক প্রাচীনকালের যৌগ, মৌল ও অনেক অনাবিষ্কৃত রহস্য অপেক্ষা করছে।

তারকাপুঞ্জ বা কন্সটেলেশনঃ

কন্সটেলেশন হল মহাকাশের অন্যতম আরেকটি রহস্য। খেয়াল করেছেন কি রাতের তারাভরা আকাশে তারাগুলোতে ইচ্ছে করলেই খুজে বের করা যায় এক প্রকান্ড হাতি, কিংবা প্রাচীন কোন গ্রীক বীর, বা কোন সিংহের মুখ? এভাবেই এসব থেকেই সম্ভবত প্রাচীন গ্রীক মিথগুলো এসেছে। তারা মনে করত আকাশে থাকেন জিউস,এপোলো,হেইডিস,হারকিউলিস ইত্যাদি ইত্যাদি দেবতারা। প্রাচীন গ্রীক মনিষী টলেমি আকাশে ৪৮টি কন্সটেলেশন খুজে পেয়েছিলেন। বর্তমানে ৮৮টি পাওয়া গেছে। কিছু কন্সটেলেশন উত্তর গোলার্ধ ও কিছু শুধু দক্ষিন গোলার্ধ থেকে দেখা যায়। কিন্তু রাশিচক্রের কন্সটেলেশন দুই মেরু থেকেই দেখা যায়।

কন্সটেলেশন কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছেও চমকপ্রদ। কিন্তু তাদের কাছে মিথ নয়, নতুন তারা পাবার সোপান হিসেবেই এরা গুরুত্বপূর্ণ।

মন্তব্য করুন

comments