X

চট্টগ্রাম কি আসলেই বাণিজ্যিক রাজধানী?

একজন ‘চাঁটগাইয়া’র কাছে যদি জানতে চান, ‘চট্টগ্রামে আহামরি এমন কী আছে?’ উত্তরে সে পাল্টা প্রশ্ন করবে, ‘কী নেই বলুন?’ তারা আপনাকে জানাবেন, চট্টগ্রাম বন্দর বিশ্বের অন্যতম বন্দরগুলোর একটি, ভৌগলিকভাবে চট্টগ্রাম এ অঞ্চলে সবচেয়ে উপযুক্ত স্থানে রয়েছে, একটি গভীর সমুদ্র বন্দর যদি করা যায়, তাহলে তো আর কথাই নেই!

চট্টগ্রাম নদীবিধৌত অঞ্চল, সবধরনের শিল্পের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। শুধু পর্যটন নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে সেখানে। এই অঞ্চলের খুব কম এলাকাই আছে যাকে ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে চট্টগ্রামের সঙ্গে তুলনা করা যায়।

চট্টগ্রামের ইতিহাস অনেকদিনের, দু’হাজার বছরেরও বেশি। এক সময়কার আরব বন্দর, পর্তুগিজ জলদস্যুদের ঘাঁটি, আরাকানিদের ঘাঁটি এ শহর। তারপর এসেছিল বিলাতিরা। ভারতের মুম্বাইয়ের আগে চট্টগ্রামে বন্দর নির্মিত হয়েছিল।

আমার দাদাবাড়ি চট্টগ্রামে নয় এবং আমি সেখানকার বাসিন্দাও নই। আমিও ‘চাঁটগাইয়া’দের সঙ্গে একমত। কাজের কারণে সেখানে গিয়ে সেখানকার যে সম্ভাবনা দেখি, তাতে আমার মনে হয় বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় চট্টগ্রামকে অবহেলা করা হয়েছে।

আমার মনে পড়ে, গত কোনও এক সরকারের সময় অন্তত দশজন মন্ত্রী ছিলেন যারা চট্টগ্রামের বাসিন্দা। তারা সবাই খুব প্রভাবশালী ছিলেন। তারা অনেক কাজ করেছেন বটে। তবে তাদের কাছ থেকে যুতটুকু আশা করা হয়েছিল, ততটুকু তারা করেননি। বর্তমান সরকারেও অনেক ‘চাঁটগাইয়া’ প্রভাবশালী ব্যক্তি আছেন। তারা চট্টগ্রামের জন্য কী করছেন তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

চট্টগ্রামে গেলেই শহরের মানুষগুলোর দুর্বিষহ জীবন চোখে পড়ে। আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে চট্টগ্রামের বিপুল অবদান থাকে সত্ত্বেও কেমন যেন শুধু পিছিয়েই যাচ্ছে শহরটি। সরু ও ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে জনপরিবহনে বিশৃঙ্খলা, ট্রাফিক ব্যবস্থায় নৈরাজ্য, গ্যাস-বিদ্যুতের অভাব— সব মিলিয়ে এই নগরের অবস্থা খুব ভালো নয়।

চিন্তা করুন, একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী শাহ আমানত বিমানবন্দরে নেমে গাড়ি চড়ে শহরে আসছেন। তার কেমন অভিজ্ঞতা হবে ভেবে দেখেছেন? একটি বিমানবন্দর থাকলেই হলো? আর কিছুর প্রয়োজন নেই?

চট্টগ্রামের উন্নয়ন হচ্ছে না, তা বলব না। তবে এসব উন্নয়ন কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই হচ্ছে, তা সেখানে গিয়ে চারিদিকে চোখ মেললেই বোঝা যায়। এ কারণে এই বাণিজ্যিক রাজধানীখ্যাত শহরটি দিন দিন একটি ভারসাম্যহীন কষ্টের নগরীতে রূপ নিচ্ছে।

ঢাকা শহরের ক্ষেত্রে যেমন হয়েছে, তেমন চট্টগ্রামও বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। কোনও চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই পাহাড়-টিলা কেটে অথবা খুঁড়ে ভবন ও বস্তির সারি, খাল-ছরা ও নালার ওপর মার্কেট ও ঘরবাড়ি, পুকুর-দীঘি ভরাট করে এই নগরীর শোভা হারিয়ে গেছে।
চট্টগ্রামে জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে। সে তুলনায় আবাসন বাড়ছে না। যা হচ্ছে তার বেশিরভাগই অপরিকল্পিত।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে জনসংখ্যা। বছরে যোগ হচ্ছে অন্তত ৫০ হাজার নতুন মানুষ। বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, সড়ক, পার্ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পানি ও বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা, গণপরিবহনসহ নাগরিক সুবিধাগুলো কমে গেছে।

ব্রিটিশ আমলের মাঝামাঝি সময়ে আমাদের দেশের অন্যতম প্রাচীন পৌর শহর হিসেবে ১৮৬৩ সালের ২২ জুন ‘দ্য চিটাগাং মিউনিসিপ্যালটি’র সূচনা হয়। তখন মাত্র ৬ বর্গমাইল আয়তনের পাঁচটি ওয়ার্ড নিয়ে শহরটি যাত্রা শুরু করেছিল। ১৮৬৯ সালে শহরে জনসংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৫৯৮ জন। এখন ৪১টি ওয়ার্ড নিয়ে জনসংখ্যা ৫৫ লাখের বেশি। তাহলে?

আপনি নিজেই যখন বিমানবন্দর থেকে আসছেন, কী দেখবেন? রাস্তার ওপর লম্বা-লম্বা কার্গো-লরি সারি করে পার্ক করা রয়েছে এবং সে কারণে রাস্তার বেশিরভাগই চলাচলের অযোগ্য হয়ে রয়েছে। এই কার্গো-লরিগুলো রাখার জন্য কিন্তু আলাদা ডিপো আছে। কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে এগুলো সেখানে রাখা হয় না। অতি সম্প্রতি ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ককে চওড়া করা হয়েছে। তা করতে আমাদের প্রায় চল্লিশ বছর সময় লেগে গেল!

চট্টগ্রামের উন্নয়নের কথা ভাবতে-ভাবতেই প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর পেরিয়ে গেছে। এই সেই চট্টগ্রাম যেখান থেকে আমাদের ৪০ ভাগ শিল্প উৎপাদন আসে, ৮০ ভাগ অভ্যন্তরীণ ব্যবসা হয় এবং ৫০ ভাগ সরকারি আয় আসে। চট্টগ্রামের পুঁজিবাজারে সাতশ’র বেশি কোম্পানি প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে।

একটা সময় ছিল যখন দেশি ও বিদেশি সবচেয়ে পুরনো কোম্পানিগুলোর সদরদফতর চট্টগ্রামে ছিল। ইউনিলিভার ও রেকিটের মতো কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসা চালাত চট্টগ্রাম থেকে। তারা চট্রগ্রাম ছেড়েছে যখন ব্যবসার সুযোগ-সুবিধা সেখানে কমে গেছে। এখনও দেশের প্রায় সব ইস্পাত কারখানাগুলো রয়েছে চট্টগ্রামেই।

চট্টগ্রামের পর্যটন স্থানগুলোর মধ্যে এখনও পতেঙ্গাতেই লাখ-লাখ মানুষ বেড়াতে যায়। অনেকদিন ধরে, সেই নব্বইয়ের দশক থেকে আমাদের বলা হচ্ছে— পতেঙ্গার অবকাঠামোর উন্নয়ন করা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনও উন্নয়নই আমাদের চোখে পড়েনি। চট্টগ্রামে দু’টি অস্বাভাবিক সুন্দর সমুদ্র সৈকত আছে— পার্কি ও কাট্টালি। বহু বছর ধরে সবাই দাবি করে আসছে এগুলোর উন্নয়নের জন্য। কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি। কিছু অপরিকল্পিত কাঠামো গড়ে উঠেছে সেখানে।

ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং গণপরিবহনের কথা আগেই বলেছি। একটু বৃষ্টি হলেই প্রায় পুরো চট্টগ্রাম শহর হাঁটু-পানিতে তলিয়ে যায় এবং জনজীবন অচল হয়ে পড়ে। অনেকে অনেক কিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু চট্টগ্রামবাসী সেই হাঁটুজলেই রয়ে গেছেন।

‘চাঁটগাইয়া’দের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যায় কতটা হতাশ তারা। তারা মনে করেন, তাদের শহরের উন্নয়ন করার সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। তাদের এই শহর অনন্য এক শহর। যে পাঁচটি উপাদান একটি শহরকে অনন্য করে তার সবই আছে এখানে। সমতল ভূমি, পাহাড়, নদী, বন ও সমুদ্র। এমন স্থান বিশ্বে বিরল।

এ শহরকে আমরা আদর করে বাণিজ্যিক রাজধানী বলে ডাকি। কিন্তু এমন অবস্থায় বিশ্বের কোনও বাণিজ্যিক রাজধানী ধুঁকে-ধুঁকে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে, তা আমাদের জানা নেই। বর্তমানে যেমন করে চলছে আমাদের এই বাণিজ্যিক রাজধানী, তেমন করে চললে আর কতদিন সে অনুন্নয়নের ভার কতটা বইতে পারবে তা চিন্তা করার সময় এসেছে বোধ হয়।

লেখক ও সাংবাদিক: ইকরাম কবীর

মন্তব্য করুন

comments