একটি শহরের অপমৃত্যু

85
শেয়ার
রাজেশ কর্মকার

জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম।

১৯৯৯ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত সময়টা আমার চট্টগ্রামে কেটেছে। সেই তখনও দেখতাম বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, চকবাজার এলাকা বুক সমান পানিতে ডুবে থাকতো আর আজ প্রায় বিশ বছর পরেও এসে দেখি অবস্থা ঠিক একই আছে। কোন পরিবর্তন নেই। সেই সময় থেকেই শুনে আসছি চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতার মূল কারনগুলো হচ্ছেঃ

১. প্রভাবশালী মানুষদের দখলের কারনে শহরের সবকটি খাল ও নালা সংকুচিত হয়ে আসা এবং খাল ও নালার মুখ বন্ধ হয়ে পানি নামতে না পারা।
২. পানি বের করে দেয়ার জন্য নালা ও খালের সাথে পরিকল্পিতভাবে ড্রেনেজ কানেক্টিভিট না থাকা।
৩. চট্রগ্রামের হালিশহরে্র অদূরেই সমুদ্রের অবস্থান। সেখান থেকে আসা জোয়ারের পানিতে হালিশহর থেকে আগ্রাবাদ পর্যন্ত ডুবে যাওয়া নিত্য ঘটনা।
৪. কলকারখানা, গার্মেন্টস বর্জ্য এবং প্লাস্টিক জাতীয় পন্যের ভারে ড্রেনসমূহের স্বাভাবিক পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং একপর্যায়ে তা উপচে পড়া।

উপরের এই কারনগুলো চট্রগ্রামের জনগন থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার ও জাতীয় সরকারসহ দেশের সবারই জানা। আমার মনে হয়না গত বিশ বছরের মাঝে এমন কোন বছর বাদ পড়েছে যে বছর এই খাতে সরকারি বরাদ্ধ ছিলো না। কিন্তু ফলাফলের দেখা যায় অর্জনের খাতায় শূন্য। বরংচ, ফি বছর চট্রগ্রামের জনগনের দূর্ভোগ আর দূর্দশা পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলেছে। প্রকল্প আসে প্রকল্প যায় কিন্তু এখানকার মানুষের দূর্ভোগ আর কাটেনা।

আগ্রাবাদ এক্সেস রোড

— উপরে উল্লেখিত ৪ নং কারনের সমাধান কি চিন্তা করলে বলা যায় এক্ষেত্রে জনগনের সচেতনতার কোন বিকল্প নেই।

— ৩ নং কারনের সমাধানের ব্যাপারে আমি খুব বেশি কিছু বলতে পারবো না তবে এটা বলতে পারি, হালিশহর তথা চট্রগ্রাম শহরের এই অংশকে রক্ষা করতে হলে সেখানে সমুদ্র পাড় বরাবর কোন বাঁধ তৈ্রি করা যায় কিনা। যদিও বিশেষজ্ঞরা এই ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন যেহেতু এখানে নদী, সমুদ্র এবং জনবসতি তিনটাকে সমন্বয় করেই কাজ করতে হবে।

— ২নং কারনের সমাধান থাকলে সেটা একমাত্র সিটি কর্পোরেশন কিংবা চউকের হাতেই আছে যেহেতু এই কাজগুলো তারাই করে থাকে সাধারনত। তবে এখানে আমার একটা কথা আছে; “একটা শহরকে আপনি সিটি কর্পোরেশন বলছেন আবার পাশাপাশি শহরের উন্নয়নের জন্য চট্রগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও রেখেছেন। এর ফল হচ্ছে এই দুই প্রতিষ্ঠানের ঠোকরাঠুকরিতে কাজের কাজ কিছুই না হওয়া।” তাই যে কোন একটি সংস্থাকে শহরের পুরো দেখভালের দায়িত্ত্ব দেয়া উচিত বলে মনে করি।

— ১নং কারনের সমাধান যদি চান তবে বলবো, প্রশাসনের কাছে তো অবশ্যই লিষ্ট আছে কারা কারা অবৈধ দখলদার এবং কারা কারা নালা ও খালের জায়গা দখল করে কল কারখানা, ঘরবাড়ি ও বিল্ডিং তৈ্রি করেছেন। যদি সত্যি সত্যি আপনারা সমাধান চান তবে এখনই মোক্ষম সময় সকল অবৈধ স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিয়ে খাল ও নালার পানি চলাচলে স্বাভাবিক রাস্তা বের করা যাতে পানি সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়তে পারে।

সবচাইতে বড় কথা চট্রগ্রামের জনগনকে সবার আগে চাইতে হবে তারা এর সমাধান চান কি না। যারা অবৈধ দখলদার তারাও চট্রগ্রামেরই মানুষ এবং আপনার আমার আশেপাশেই আছেন তারা। আপনারা চট্রগ্রামের মানুষরা যদি এখনই এই অচলাবস্থা নিরসনে মাঠে না নামেন তবে মনে রাখবেন আপনাদের জন্য সামনে আরো দূর্ভোগ অপেক্ষা করছে।

একটা শহর চোখের সামনে দিয়ে ধ্বসে পড়ছে তবুও আপনারা জেগে উঠছেন না কেউ। আপনার ভবিষ্যত প্রজন্মকে কোথায় ফেলে রেখে যাচ্ছেন একবার ভেবেছেন কি?

আপনারা যদি না জাগেন তবে এই সমস্যার সমাধান আগামী বিশ বছরেও দেখবো কিনা সন্দেহ আছে। প্লিজ, চুপ করে না থেকে আওয়াজ তুলুন। আপনার ঘরের পাশে খাল বা নালার যে অংশটি অবৈধভাবে দখল হয়ে আছে প্রশাসনের সাহায্যে তা বুলডোজার দিয়ে দিয়ে গুড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করুন।

আবারও বলছি, ঠিক এই সময়টাই মোক্ষম সময়। শুকনো মৌসুমে শত চিল্লানোতেও কাজ হবেনা। আর স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ, প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত চট্রগ্রামকে রক্ষা করুন আপনাদের সর্বশক্তি দিয়ে।

ভালো থাকুক চট্রগ্রাম।

প্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত। এর কোন দায়-দায়িত্ব চাটগাঁ পোর্টাল এর উপর বর্তায় না

মন্তব্য করুন

comments