এই চাটুকারিতার শেষ কোথায়?

118
শেয়ার

সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশটাকে আবার নিজের পায়ে দাড় করানোর জন্য বঙ্গবন্ধু যখন রীতিমতো গলদঘর্ম। তখন তিনি দেখতে পেলেন তার দলেরই কিছু নেতা-কর্মী দুর্নীতি আর লুটপাটে ব্যস্ত। তাই তিনি মনোঃকষ্ট নিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি বিদেশ থেকে ভিক্ষে করে রিলিফ আনি, চাটার দল সব চেটে খাচ্ছে। আমার চারদিকে শুধু চাটার দল।’

তিনি আরো বলেছিলেন, ‘দেশ স্বাধীন করে অন্যেরা পায় তেলের খনি, সোনার খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি’। খুব ভুল কিছু কি বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু? পরিস্থিতি কি আদৌ বদলেছে? নাকি চাটার দল আরো ভারী হয়েছে।’

এবার প্রসঙ্গে আসি। সম্প্রতি শিশুর আঁকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি দিয়ে কার্ড প্রকাশ করে বরগুনার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গাজী তারিক সালমান বেশ বিপাকেই পড়েন। তার বিরূদ্ধে অভিযোগ উঠে তিনি বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃতির সাথে জড়িত।

বঙ্গবন্ধুর প্রতি এহেন অবমানয়ায় অ্যাডভোকেট ওবায়েদুল্লাহ সাজু “মর্মাহত হন” এবং “তার হৃদকম্পন বেড়ে যায়”। এর ফলে তিনি মামলা করেন! এর প্রেক্ষিতে ৭ জুন গাজী তারিক সালমনের বিরুদ্ধে ৫ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলাটি করেন বরিশালের আইনজীবী সমিতির সভাপতি ওবায়েদ উল্লাহ সাজু। তিনি আবার বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদকও।

ওই মামলায় সমন জারির প্রেক্ষাপটে নির্ধারিত দিন বুধবার ১৯ জুলাই আদালতে হাজির হন তারিক সালমান। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বরিশালের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো. আলী হোসাইন। একই বিচারক দুই ঘণ্টা পর ইউএনও তারিকের জামিন মঞ্জুর করেন।

অ্যাডভোকেট ওবায়েদউল্লাহ সাজু ভেবেছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রতি অতিপ্রেম দেখিয়ে চাটুকারীর পুরষ্কার হিসেবে বাগিয়ে নিতে পারবেন আরও ভালো কোন পদ। এর পাশাপাশি এই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতি অতীত কোন ক্ষোভের প্রতিশোধও নিয়ে নেবেন। কিন্তু প্রিন্ট মিডিয়া আর সোশ্যাল মিডিয়া তার সেই মনোবাসনা পূরণ হতে দেয়নি।

বিশেষ করে ফেসবুকজুড়ে উঠে সমালোচনার ঝড়। শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিকসহ সাধারণ ফেসবুক ব্যবহারকারীদের অনেকেই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। এ ঘটনা জানার পর প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন গতকাল ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। পাঠকেদের জন্য সেটি নিচে তুলে দেয়া হলো।

ফেসবুকসহ অনলাইন ও অফলাইন জুড়ে প্রবল প্রতিবাদের মুখে এ ঘটনা পৌঁছে যায় সরকারের উচ্চপদস্থ মহলে, তোলপাড় শুরু হয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও প্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনা হলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং!

প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনা জানার পর কি বলেছেন সেটা জানার আগে জেনে নিই আসলে তারিক সালমান কিভাবে বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করেছিলেন। বরগুনা সদর উপজেলায় বদলী হয়ে আসার আগে বরিশালের আগৈলঝাড়ার ইউএনও থাকাকালীন এই বছরের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। তিনি বলেছিলেন প্রতিযোগিতায় প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকারী শিশুদের আঁকা ছবি দিয়ে কার্ড ছাপাবেন।

প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইউএনও পঞ্চম শ্রেণী পড়ুয়া এই বাচ্চাটার ছবিটা স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে এক নিমন্ত্রনপত্রে ওই কার্ড ছেপেছিলেন। কার্ডের প্রচ্ছদে প্রতিযোগিতায় ‘গ’ গ্রুপে প্রথম হওয়া আগৈলঝাড়া এসএম বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী জ্যোতির্ময়ের আঁকা মুক্তিযুদ্ধের রণক্ষেত্রের একটি ছবি এবং শেষ প্রচ্ছদে (ব্যাক কাভার) ‘খ’ গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান অধিকারী আগৈলঝাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী অদ্রিজা করের আঁকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয়েছিল।

এখন বিষয় হলো প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোন মামলা বা তাকে কোন শাস্তি দিতে হলে হলে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। আর এ কথা বলছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও প্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম। তাহলে কিভাবে মামলাটি দায়ের ও আমলে নেয়া হলো? ২০ জুলাই বৃহস্পতিবার পত্র-পত্রিকায় এই খবর দেখে তিনি ও প্রধানমন্ত্রীর দফতরের কর্মকর্তারা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। সাথে সাথে তিনি বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে আনেন।

এইচ টি ইমাম বলেন, মামলা দায়েরকারী ব্যক্তি সম্পর্কে সঙ্গে সঙ্গে আমরা খোঁজ নিই, এই লোক পাঁচ বছর আগেও আওয়ামী লীগে ছিল না। দলের ভেতরে ঢুকা পড়া এই ‘অতি উৎসাহীরাই’ এই কান্ড ঘটিয়েছে, এই চাটুকাররাই আমাদের ক্ষতি করছে’ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এবার চলুন জানি প্রধানমন্ত্রী কি বলেছেন। এইচ টি ইমাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্ধৃত করে বলেন, ছবিটি দেখে তিনি বিস্মিত হলেন এবং বললেন,

ক্লাশ ফাইভের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে এই অফিসার সুন্দর একটি কাজ করেছেন। এবং সেখানে যে ছবিটি আঁকা হয়েছে, সেটি আমার সামনেই আছে, আপনারা দেখতে পারেন। এবং এই ছবিটিতে বিকৃত করার মতো কিছু করা হয়নি। এটি রীতিমত পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। এই অফিসারটি রীতিমত পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। আর সেখানে উল্টো আমরা তার সঙ্গে এই করেছি। এটি রীতিমত নিন্দনীয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে একটা ক্লাস ফাইভে পড়া বাচ্চার আঁকা ছবি কিভাবে বিকৃত ছবি হয়? এ বিষয়ে তারিক সালমানের ভাষ্য, ‘স্বাধীনতা দিবসে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এক শিশুর আঁকা জাতির জনকের ছবি ব্যবহার করে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র ছাপা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রতি শিশুদের ভালবাসা সৃষ্টি এবং ছবি আঁকার প্রতি তাদের আগ্রহী করে তোলা।’

পঞ্চম শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থীর আঁকা বঙ্গবন্ধুর ছবি কিভাবে বিকৃত হয় এই প্রশ্ন করা হলে ওবায়েদ উল্লাহ সাজু বলেন, ‘বঙ্গববন্ধুর যে ছবি ছাপা হয়েছে সেখানে অনেক অসঙ্গতি আছে। বঙ্গবন্ধুর ব্যাকব্রাশ, ফিগার এবং আরও কিছু বিষয় সঠিকভাবে আঁকা হয়নি। গলায় একটা মাফলার দেওয়া হয়েছে, যা ঠিক হয়নি। শুধু ‘বিকৃত’ ছবিই বিষয় নয়। বঙ্গবন্ধুর ছবি কার্ডের দ্বিতীয় পাতায় ছাপা হয়েছে। এটাও বঙ্গবন্ধুর অবমাননা। বঙ্গবন্ধুর ছবি কেন প্রথম পাতায় ছাঁপা হলো না?’

অথচ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর হুবহু ছবি আজ পর্যন্ত কেউ আঁকতে পারেনি। আমরাও যেগুলো ব্যবহার করি ওইসব ছবিতেও কিছু খুঁত থাকে। হুবহু হয় না, আমি তো জানি।’ তিনি আরো বলেন, ‘ছবি ব্যবহার করা নিয়ে যারা এটা করেছে, তারা নিশ্চয়ই দলের ও সরকারের জন্যে ভালো কিছু করেনি।’

প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে ওবায়েদউল্লাহ সাজুর মতো ধান্ধাবাজ সুবিধাবাদীরা তৃণমূলে এমন দাপটের রাজনীতি করেন। পাঁচ বছর আগেও যে সাজু আওয়ামীলীগে ছিলেন না, রাতারাতি নেতা বনে গিয়ে সরকারী কর্মকর্তাকে এভাবে হেনস্থা করার ধৃষ্টতা দেখান। এনার মতই এক শ্রেণীর চাটুকার বিভিন্ন সময়ই এ ধরনের মামলা করে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলছে। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করে অতি উৎসাহী অনেক ব্যক্তি এবং অনেক ভূঁইফোড় সংগঠনের কর্মকান্ড তাদের দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে।

এ প্রসঙ্গে এইচ টি ইমাম বলেন, এই ঘটনার পেছনে তিনটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, এই অফিসারের বিরুদ্ধে হয়তো তাদের কোন ক্ষোভ ছিল। তাকে অপমানিত করা ছিল তাদের লক্ষ্য। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন সার্ভিসের মধ্যে একটি অসন্তোষ সৃষ্টি করা। আর তৃতীয়ত, সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করা। কারণ যাই হোক, মূল কারণ হলো দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে যেকোন হীন স্বার্থ চরিতার্থ করাই থাকে এদের সব কর্মকান্ডের পেছনের উদ্দেশ্য।

এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বিভিন্ন সময় দলে আলোচনা হলেও তাদের থামানো যাচ্ছে না। এ নিয়ে দলের ভেতর ক্ষোভও রয়েছে। যারা সরাসরি রাজনীতির সাথে যুক্ত নন তারা মনে করেন এইসব অতি উৎসাহীদের শুধু রাজনীতি থেকেই নয়, সমাজ থেকেই এদের বিতাড়িত করা উচিৎ।

আর তারিক সালমান বলেন ‘আমি চাই, আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র যারা করেছেন, তাদের বিচার হোক। আমাকে যারা কলঙ্কিত করার ষড়যন্ত্র করেছেন, তাদের বিচার হোক। আমি বিশ্বাস করি, আমার আবেদন করতে হবে না। প্রধানমন্ত্রী সুবিবেচক। তিনি নিজ উদ্যোগেই ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।’

অবশেষে সেই ‘অতি উৎসাহী’ ওবায়েদ উল্লাহ সাজুকে আওয়ামী লীগ থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় তাকে সাময়িক বহিষ্কারের এই নির্দেশ দেওয়া হয়। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আজকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাময়িক বহিষ্কারাদেশ ও কারণ দর্শাও নোটিশ শিগগিরই বরিশালে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। সন্তোষজনক জবাব না পলে তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে।’

সময় থাকতে এই সাজুর মত সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সুবিধাবাদী চাটুকারদের নিয়ন্ত্রন করতে না পারলে এরকম ঘটনা আরো ঘটতে থাকবে। শুধু তাই না, এধরনের চাটুকাররা যেকোন রাজনৈতিক দল তথা পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজের শৃঙ্খলার জন্য হুমকি।

আমাদের বিশ্বাস সেই উপলব্ধি বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আছে। কারণ, গত বছর অক্টোবরে আওয়ামী লীগের ২০তম সম্মেলনে লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নূর উদ্দিন চৌধুরী বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে যখন অনেক বেশি প্রশংসা করতে থাকেন। তখন শেখ হাসিনা নিজেই তাকে বলেন, ‘এত তেল দিয়েন না।’

কৃতজ্ঞতাঃ বিবিসি বাংলা, বাংলা ট্রিবিউন

মন্তব্য করুন

comments