X

কোটা পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।বুধবার জাতীয় সংসদে তিনি বলেছেন, যেহেতু ছাত্ররা কোটা ব্যবস্থা চায় না, সেহেতু এখন থেকে আর কোটা থাকবে না। তবে প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখার কথা জনিয়ে তিনি বলেন, যদি দরকার হয় মন্ত্রিপরিষদ সচিব সংশ্লিষ্টদের নিয়ে এ বিষয়ে কাজ করবেন।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিরক্তি প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যথেষ্ট হয়েছে, এবার তারা ঘরে ফিরে যাক। আন্দোলনের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে এতে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার কথাও বলেন শেখ হাসিনা। বুধবার (এপ্রিল) দশম জাতীয় সংসদের ২০তম অধিবেশনের চতুর্থ কার্যদিবসে প্রধানমন্ত্রীর উত্তরদানের জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারি দলের সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। এর আগে বিকেলে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সকালে ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক আমার কাছে এলো। তারা বলল, আমরা ঘুমাতে পারছি না, ছাত্ররা রোদে বসে আছে, তাদের তো অসুখ-বিসুখ হবে। রাস্তা অবরোধের কারণে কেউ অফিস-আদালতে যেতে পারছে না, রোগীরা হাসপাতালে যেতে পারছে না, এভাবে তো চলতে পারে না।
শেখ হাসিনা বলেন, কোটা নিয়ে যখন এতকিছু, তখন কোটাই থাকবে না। কোন কোটারই দরকার নেই।

শেখ হাসিনা বলেন, কোটা থাকলেই সংস্কারের প্রশ্ন আসবে। এখন সংস্কার করলে আগামীতে আরেক দল আবারও সংস্কারের কথা বলবে। কোটা থাকলেই ঝামেলা। সুতরাং কোন কোটারই দরকার নেই।

বক্তব্যের শুরুতে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, একটি দেশ তখন উন্নত হয় যখন একটি শিক্ষিত সমাজ গড়ে ওঠে। শিক্ষিত সমাজের কর্মক্ষেত্র প্রসারিত করতে আমরা সে ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছি। আমাদের সরকারের আমলে ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে, বৃত্তি পাচ্ছে, বিনা পয়সায় বই পাচ্ছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করবে, মানুষের মতো মানুষ হবে, তারা দেশ পরিচালনা করবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ছাত্ররা দাবি করেছে, আমিও বসে থাকিনি। আমাদের সেতুমন্ত্রী দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে পাঠিয়েছি। তিনি ছাত্রদের সঙ্গে বসেছেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে নির্দেশ দিয়েছি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে। মন্ত্রী তাদের সঙ্গে বসল, একটা সমঝোতা হলো। অনেকে মেনে নিল কিন্তু অনেকে মানল না। টিএসসিতে অনেকে থেকে গেল, কেন? যখন আলোচনা হয়েছে, কথা হয়েছে তাহলে কেন চারুকলায় অবস্থিত মঙ্গল শোভাযাত্রা পুড়িয়ে তছনছ করা হলো। আর মেয়েরাও হল থেকে বেরিয়ে আসল। আমি সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানককে পাঠালাম, আলোচনা করল, তাদের ফিরে যাওয়ার কথা বলা হলো কিন্তু তারা মানল না, আন্দোলন চালিয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা একটা নীতি নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করি। যারা আন্দোলনে নেমেছে তারা আমার নাতীর বয়সী, তাদের ভালো কিসে, আমরা তো ভালো জানি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ আমিই তৈরি করে দিয়েছি, এখন সবাই ফেসবুক, ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির শিক্ষা ব্যবস্থা আমরাই চালু করেছি। এখন সেগুলো ব্যবহার করে গুজব ছড়ানো হলো, এক ছেলে মারা গেছে। রাত ১টার সময় হলের ছাত্রীরা গেট ভেঙে রাস্তায় নেমে এলো। যদি কোন বিপদ হতো, কে দায়িত্ব নিতো? পরে ওই ছেলে মারা যায়নি, নিজেই ফেসবুকে জানিয়ে দিল তখন তাদের মুখটা কোথায় গেল? এরপর শুরু হয় যত অঘটন, ভাঙচুর, লুটপাট; এর দায় কে নেবে? প্রশ্ন রাখেন প্রধানমন্ত্রী।

ভিসির বাড়িতে আক্রমণ হলো, আমরাও তো আন্দোলন করেছি। আমরা তো কখনও এমনটি করিনি। ভিসির বাড়িতে এমন ভাঙচুর, ভিসির বাড়ির ছবি দেখে মনে হয়েছে পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে যেভাবে ভাঙচুর চালিয়েছিল, লুটপাট করেছিল, ভিসির ছেলেমেয়ে ভয় পেয়ে লুকিয়ে ছিল, একতলা-দোতলা ভবন তছনছ করা হলো, পরে সিসি ক্যামেরা নিয়ে চলে গেল, আমি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। যারা ঘটিয়েছে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলে আমি মনে করি না। যারা ভাঙচুর করেছে, লুটপাট করেছে, ছাত্রদেরই সেগুলো খুঁজে বের করে দিতে হবে। আমরা গোয়েন্দা সংস্থা নামিয়েছি তারা খুঁজে বের করবে। এর বিচার অবশ্যই হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭২ সাল থেকে কোটা ব্যবস্থা চলছে। ৩৩তম বিসিএসে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হয়েছে ৭৭ দশমিক ৪০ ভাগ শিক্ষার্থী, আর ৩৫তম বিসিএসে মেধার ভিত্তিতে ৬৭ দশমিক ৪৯ ভাগ শিক্ষার্থীকে, ৩৬তম বিসিএসএ ৭০ দশমিক ৩৮ ভাগ শিক্ষার্থীকে মেধায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে। মেধাবীরা কিন্তু বাদ যায়নি। যেখানে কোটা পাওয়া যাবে না, মেধা তালিকা থেকে দেয়া হবে। এটা কিন্তু চলছে, জানি না ছাত্ররা এটা জানে কিনা। আমরা মেধা তালিকা থেকে তো নিয়োগ দিচ্ছি। আর এ নিয়ে ঢাবির কিছু অধ্যাপক, শবি’রও কিছু তাল মিলিয়েছে। বিভিন্ন জেলায় কোটা সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা চাকরি পেত না। জুডিশিয়াল সার্ভিসে মেয়েরা ঢুকতে পারতো না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এসে এটা বাতিল করলেন। আমরা নারীদের চাকরিতে কোটার ব্যবস্থা করি, কিন্তু এখন মেয়েরাও রাস্তায়। তার মানে তারাও কোটা চায় না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি তো খুশি, আমি নারীর ক্ষমতায়নে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছি, মেয়েরা যখন চাই না তাহলে কোটার দরকার নাই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধীদের জন্য আমরা অন্যভাবে চাকরির ব্যবস্থা করবো।

উল্লেখ্য, বর্তমানে সরকারি চাকরিতে নিয়োগে ৫৬ শতাংশ পদ বিভিন্ন কোটার জন্য সংরক্ষিত; এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, জেলা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৫ শতাংশ, প্রতিবন্ধী ১ শতাংশ। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী ‘ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ কোটার পরিমাণ ১০ শতাংশে কমিয়ে আনার দাবি তোলে।

মন্তব্য করুন

comments