X

আগামী নির্বাচন যথাসময়েই অনুষ্ঠিত হবে : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, বিএনপি আসুক বা না আসুক সংবিধান অনুযায়ী আগামী নির্বাচন যথাসময়েই অনুষ্ঠিত হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন বহুদলীয় গণতন্ত্রের সময়। কোন দল নির্বাচন করবে কি করবে না এটা সম্পূর্ণ তাদের দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। কিন্তু নির্বাচন সময়মতো হবে। জনগণও ভোট দেবে।’ তিনি বলেন, ২০১৪ সালে এতো তান্ডব করেও যখন নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি, ভবিষ্যতেও ঠেকাতে পারবে না।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোমবার বিকেলে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে ইতালি সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকতের প্রশ্নের উত্তরে এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, বিএনপি যদি নির্বাচন না করে তাহলে কারো কিছু করার নেই। গতবারও তারা নির্বাচন করেনি। আমরা জানতাম তারা নির্বাচনে আসবে। কিন্তুু তারা নির্বাচনে আসেনি। এবারও যদি কোন দল না আসে, সেখানে আমাদের কী করার আছে?

শেখ হাসিনা বলেন, এটা যদি আপনারা বলেন, আমি শাস্তি দিয়েছি, আমি তুলে নেবো, সেটাতো আমি পারবো না। আদালত তাকে (খালেদা) শাস্তি দিয়েছে। আর মামলা করেছে দুদক।
খালেদা জিয়াকে মুক্তি না দিলে তার দল নির্বাচনে যাবে না বলে বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এক মন্তব্যের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউ যদি বলে নির্বাচন করতে দেবো না, এটা গায়ের জোরের কথা, যেটা বিএনপি বলতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বিএনপি’র জন্ম, রাজনৈতিক দল হিসেবে ক্যান্টনমেন্ট থেকে আত্মপ্রকাশ এবং জিয়াউর রহমানের পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খানের স্টাইলে ক্ষমতা দখলের ইতিবৃত্ত এবং তথাকথিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ‘হাঁ’ ’না’ ভোটের ইতিবৃত্ত তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, বিচারপতি সায়েমকে অস্ত্রের মুখে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে জেনারেল জিয়া প্রেসিডেন্ট হন। ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত থাকায় মোশতাক ক্ষমতা নিয়েই জিয়াকে সেনাপ্রধান বানিয়ে দিলেন। জিয়া তার কতটা বিশ্বস্ত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঠিক আইয়ুব খানের মতো একই অঙ্গে দুই রূপ নিয়ে তিনি (জেনারেল জিয়া) ক্ষমতায় এলেন।’

প্রধানমন্ত্রীর ইতালি সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও আগামী নির্বাচন, খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলা, পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং রোহিঙ্গা সমস্যাগুলো ঘুরে ফিরে আসে।

দুর্নীতিবাজদের দলে না নেয়া সংক্রান্ত বিএনপি’র গঠনতন্ত্রের সংশ্লিষ্ট ধারাটির পরিবর্তন করে বিদেশে অবস্থানরত দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত তারেক রহমানকে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব প্রদান সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে দুর্নীতি নিয়ে একটি পারসেপশন আছে। ব্যক্তি বিশেষের দুর্নীতির ক্ষেত্রে কিছু বলাও হয় না, করাও হয় না। এখানে খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে আদালত রায় দিয়েছে, আমাদের কিছু করার নেই।

শেখ হাসিনা বলেন, আদালতের রায় হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন যাকে করা হলো সে আবার ফেরারি আসামী। সে দেশেও নেই।প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন দেশে কি বিএনপি’র এমন কোন নেতা নেই যাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন করা যেতো?

তিনি বলেন, যিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আর রাজনীতি করবেন না বলেই মুচলেকা দিয়ে নিজের দেশ ছেড়ে চলে গেলেন। তাদের প্রিয়পাত্র ইয়াজউদ্দিন, ফখরুদ্দিন এবং মইনুদ্দিনের দেয়া দুর্নীতির মামলায় মামলায় তার শাস্তি হলো। আমেরিকার এফবিআই’র তদন্তেও তার দুর্নীতি ধরা পড়েছিল এবং এফবিআই’র লোক এ দেশে এসে আদালতে স্বাক্ষ্য দিয়ে গেছে। পরে তার ৭ বছরের সাজা ও ২০ কোটি টাকা জরিমানা হয়েছে। তাকেই করতে হলো ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন।

শেখ হাসিনা মামলা নিয়ে বেগম জিয়ার টাল বাহানার অভিযোগ তুলে খালেদা জিয়ার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, মামলার ১০৯ কার্যদিবস তিনি সময় চাইলেন, অসুস্থ বলে অফিসে গিয়ে বসে থাকলেন, ২৬১ দিনের মতো ১০ বছর যাবত চলমান মামলায় তারিখ পড়লো, আপিল বিভাগে ২২ বার রিট করেছেন, হাইকোর্টে রিট করেছেন। এতো কিছু করে তিনি মামলা চণলাকালীন মাত্র ৪৩ দিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এরপরও তার সাজা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই মামলাটি রুজু হওয়ার সময় খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হককে উদ্ধৃত করে বলেন, ‘তিনি বলেছিলেন, ওই পরিমাণ টাকা জমা করে দিলেই মামলাটি প্রত্যাহার হয়ে যাবে। কারণ, টাকাটা এসেছিল এতিমদের জন্য। কিন্তুু খালেদা জিয়া টাকার মায়া ত্যাগ করতে পারেননি। ’

তিনি বলেন, ‘আমি বিস্তারিত বলবো না, আপনারা মামলার শুনানিতেই দেখেছেন, সেই টাকা কত ভাবে, কত হাত ঘুরে এতিমদের জন্য না গিয়ে ব্যক্তিগত তহবিলে চলে এসেছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এতিমের টাকা মেরে খেলে এর জন্য শাস্তি আদালতও দেয়, আল্লাহর তরফ থেকেও হয়। কারণ, আমাদের পবিত্র কোরআন শরীফেই আছে, এতিমের টাকা মেরে খাওয়া যায় না। কাজেই আমাদের কিচ্ছু করার নেই।’

শেখ হাসিনা নিজের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে বলেন, ২০০৭ সালে তাঁকে গ্রেফতার করার সময় তিনি দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করে যান। তিনি তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা বা পুত্র, বা প্রবাসের কাউকেই করেননি। অথচ খালেদা জিয়া দেশে বসবাস করে এমন কাউকেই দায়িত্ব দিয়ে যাননি।
তিনি এ সময় সাংবাদিকদের বিএনপি’র নেতাদের কাছে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করার আহবান জানান।

তারা এমন একটি দল যারা গঠনতন্ত্রের ধার ধারে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের গঠনতন্ত্রের সঙ্গে মিলিয়ে যদি পার্টি অবস্থান দেখেন, দেখবেন কোনখানেই মিলছে না।
‘তাদের গঠনতন্ত্রে যে সুবিধাটি রয়েছে তা হচ্ছে দলের চেয়ারপার্সনকেই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করা হয়েছে, যে ক্ষমতা আওয়ামী লীগে প্রেসিডিয়াম, কার্যনির্বাহী সংসদের এবং কাউন্সিলের রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নপত্র ফাঁস সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এটি নতুন কিছু না, এ ধরনের ঘটনা আগেও ঘটেছে। তবে কোনটি প্রকাশ পেয়েছে, কোনটি পায়নি। তিনি বলেন, প্রযুক্তি আমাদের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি কিছু যে সমস্যারও সৃষ্টি করেছে। এটিও একটি কারণ।

প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন পত্র ফাঁসের কারণ সম্পর্কে পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্রগুলো পৌঁছার পরে এগুলো খুলে কারো কারো ব্যক্তিগত মোবাইল ডিভাইসে ছবি তুলে বাইরে সরবরাহ করা হতে পারে বলে আশংকা করেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় পরীক্ষার আধ ঘন্টা বা ২০ মিনিট আগে। সে সময়ে শিক্ষার্থী এবং পরীক্ষা সংশ্লিষ্টরা পরীক্ষার হলেই থাকে।
আর এই স্বল্প সময়ে কেউ চাইলেও এর কতটুকু সুবিধা নিতে পারে প্রশ্ন তুলে প্রধানমন্ত্রী এই মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট বা টোটাল ডিজিটাল সিষ্টেম ব্লক করে দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন করেন।
প্রধানমন্ত্রী নিজেও বর্ণনামূলক পরীক্ষা দিয়ে পাস করে এসেছেন উল্লেখ করে সাংবাদিকদের প্রয়োজনে যদি বাস্তবিক তেমন উপকারিতা না থাকে তাহলে টিক মার্ক সিস্টেম উঠিয়ে দিতে পত্র-পত্রিকায় গঠনমূলক লেখার জন্যও আহবান জানান।

তিনি জড়িতদের চিহ্নিত করতে সচেষ্ট হতে সাংবাদিক সমাজের প্রতি আহবান জানান।

প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে ভাষাণচরে তাদের পুনর্বাসনে সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে বলেন, এই সমস্যার সৃষ্টি করেছে মিযানমার আর সমস্যাটির সমাধান করার দায়িত্বটাও তাদের। তবে, একটা বিষয় মনে রাখতে হবে তারা আমাদের নিকট প্রতিবেশী। তারপরও আমাদের পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা একটা সমঝোতায় এসেছি। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে একটি যৌথ কমিটিও করা হয়েছে। পাশপাশি যে ৫টি দেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্ত রয়েছে তাদের সঙ্গেও আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের আলাপ-আলোচনা চলছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে এখন একটা সমঝোতা হয়েছে। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে ৮ হাজার পরিবারের একটি তালিকা করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকারের উদ্যোগে মিয়ানমারের বাস্তুুচ্যুত নাগরিকদের ছবিসহ বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করে হলুদ ফিতাসহ পরিচয়পত্র প্রদান করাতেই সব কাজই এখন সহজ হচ্ছে।
তিনি বলেন, ১৯৭৬ সাল থেকে তাদের সমস্যার কারণে মিয়ানমারের নাগরিকরা এদেশে আসা শুরু করলেও অতীতের কোন সরকারই একাজ করেনি। মিয়ানমার এখন অস্বীকার করতে পারবে না, এরা তাদের নাগরিক নয়।’

প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে জাতিসংঘে তাঁর প্রস্তাব এবং কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, এটা এখন সম্পূর্ণ মিয়ানমারের ওপর। আন্তর্জাতিকভাবে তারা ব্যাপক চাপের সম্মুখীন। সবাই চাচ্ছে রোহিঙ্গাদের তারা ফেরত নিয়ে যাক এবং তাদের নিরাপত্তা দিক।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এত লোককে ফেরত পাঠানো মানে ঠেলে ফেলে দেয়া নয়, তারাও মানুষ, আলোচনার মাধ্যমেই মিয়ানমার তাদের ফেরত নিয়ে যাক।
এ প্রসঙ্গে মিয়ানমার টালবাহানা করছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এতে কোন সন্দেহ নেই এবং এটা তাদের চরিত্র।

প্রধানমন্ত্রী চালের মূল্য বৃদ্ধি সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে এরমধ্যে কোনও কারসাজি রয়েছে কি না তা সরকার খতিয়ে দেখবে বলেও উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন শুরুর আগে তিনটি সুখবর দেন, যার একটি হলো আজ থেকে দেশ ফোরজি’র যুগে প্রবেশ করেছে।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ফোরজি’র তরঙ্গ নিলাম সম্পন্ন হয়েছে। আমরা ফোরজি এবং টেক নিউট্রালিটির লাইসেন্সও প্রদান করেছি। এর ফলে বাংলাদেশ তথ্য প্রযুক্তির মহাসরণীতে আরেকটি মাইলফলক অর্জন করলো। সফলভাবে এ কাজ সম্পন্ন করায় তিনি বিটিআরসি এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ জানান।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর দ্বিতীয় সুখবরটি বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নির্মাণ এবং উৎক্ষেপণের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আগামী মার্চ মাসে সুবিধাজনক সময়ে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার অ্যারোনটিক্স এন্ড স্পেস সেন্টার থেকে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হবে।
তৃতীয় সুখবর হচ্ছে- ব্রিটেন বাংলাদেশের কার্গো বিমান পরিবহনে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, সেটা প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা উন্নয়নে তাঁর সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের ফলেই এটি সম্ভব হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা যে রপ্তানী করি সেটা নিজস্ব বিমানে দিতে পারতাম না। সেটা অন্য জায়গা থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেয়া হত। সেই নিষেধাজ্ঞা ব্রিটেন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এটা আমাদের রপ্তানী বাণিজ্যের জন্য আরো শুভ ফল বয়ে আনবে।’-বাসস

মন্তব্য করুন

comments