তিন স্তরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন চায় মিয়ানমার

23
শেয়ার

নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের তিন স্তরে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করছে মিয়ানমার। গতকাল শুক্রবার ঢাকায় দুই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে এমন পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। প্রত্যাবাসিত রোহিঙ্গাদের প্রথমে অস্থায়ী ক্যাম্পে রাখা, দ্বিতীয় পর্যায়ে বাড়িঘরে থাকার ব্যবস্থা এবং সবশেষ নাগরিকত্ব দিয়ে স্থায়ীভাবে জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করবে মিয়ানমার সরকার।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিউ সু এমন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বলে বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এছাড়া গতকালের বৈঠকে মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে রোহিঙ্গাদের এক হাজার ৬৭৩টি পরিবারের মোট আট হাজার ৩২ জনের একটি তালিকা হস্তান্তর করেছে বাংলাদেশ। তবে এই তালিকার রোহিঙ্গাদের ফেরত দেওয়ার আগেই মিয়ানমার সীমান্তের শূন্য রেখায় থাকা প্রায় সাত হাজারের মতো রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে বৈঠকে বসবে দুই দেশের স্থানীয় প্রশাসন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সে দেশে গিয়ে বৈঠকে বসবে। সেখানে শূন্য রেখায় মিয়ানমার সীমান্তে থাকাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। তিনি বলেন, আমরা মিয়ানমারকে বলেছি, শূন্য রেখায় থাকা রোহিঙ্গারা তোমাদের দেশেই আছে। তাই তাদের আগে ফিরিয়ে নাও। তারা এই বাস্তবতা স্বীকার করেছে এবং ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছে।

গত বছরের ২৩ নভেম্বর হওয়া দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী প্রথম তালিকা দিল বাংলাদেশ। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে এই তালিকা যাচাই-বাছাই করে বাংলাদেশকে দেওয়া হবে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গাদের প্রথম দলটি বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে যাবে। তবে, ঠিক কবে মিয়ানমার ফিরতি তালিকা দেবে এবং প্রত্যাবাসন শুরু হবে তার নির্দিষ্ট তারিখ গতকাল পর্যন্ত ঠিক হয়নি। মিয়ানমার সরকারের অমানবিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ১০ লাখ ৬০ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে।

গত বছরের ২৩-২৫ অক্টোবর বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমার সফর করেছেন। তার পাল্টা সফর হিসেবে গত বৃহস্পতিবার ১৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে ঢাকায় এসেছেন মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আজ শনিবার দুপুরে তার ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের হওয়া চুক্তি অনুযায়ী ফ্যামিলি ইউনিট অনুযায়ী তালিকা চেয়েছে মিয়ানমার। আমরা সেভাবেই তালিকা দিয়েছি। তারা আন্তরিকভাবে তালিকা গ্রহণ করেছে। এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, এ পর্যন্ত যেভাবে আলোচনা চলছে তাতে আমার বিশ্বাস করতে চাই যে মিয়ানমার রোঙ্গিাদের ফিরিয়ে নেবে। নির্দিষ্ট তারিখ না হওয়ার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ১০ লাখ লোকের পরিবার ভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন সময় সাপেক্ষ, পাঠানোতেও সময় লাগবে।

এখনো যে রোহিঙ্গাদের ছোট ছোট দল বাংলাদেশে আসছে এ বিষয়ে বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, তারা এই বিষয়টি স্বীকার করেছে। খুব শিগগিরই এমনভাবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা বন্ধ হয়ে যাবে বলে আমাদের আশ্বাস দিয়েছে।

গতকাল সচিবালয়ে বিকাল ৩টার দিকে দুই দেশের মধ্যে বৈঠক শুরু হয়ে সোয়া ৬টার দিকে শেষ হয়। বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, মিয়ানমারের মন্ত্রীর সঙ্গে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। আমরা তাদের এক হাজার ৬৭৩টি পরিবারের মোট আট হাজার ৩২ জনের একটি তালিকা হস্তান্তর করেছি। তারা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আসাদুজ্জামান খান কামাল আরও বলেন, তাদের সঙ্গে আলোচনা করে খুশি। তারা বলেছে যারা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে তাদের সবাইকে পর্যায়ক্রমে তারা ফেরত নেবে। তিনি বলেন, এর আগে মিয়ান সফরের সময় ১০ দফা নিয়ে একমত হয়েছিলাম। এবারও সেগুলোর বিষয়ে আমরা একমত আছি। বৈঠকে জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর উত্থাপিত পাঁচ দফা প্রস্তাব ও কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে জোর দিয়েছি। তারাও আমাদের সঙ্গে একমত হয়েছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রত্যাবাসন পরবর্তী সুরক্ষা নিশ্চিত করা, ইয়াবা চোরাচালান ও এর বিস্তার রোধে সীমান্তে যৌথ তৎপরতা ও অভিযানের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা মিয়ানমারের ৪৯টি ইয়াবা কারখানার কথা উল্লেখ করেছি। তাদের বলছি এগুলো বন্ধ করার জন্য। তারা কথা দিয়েছে এসব ইয়াবা কারখানা বন্ধ করে দেবে। এ বিষয়ে মিয়ানমারও আমাদের কাছে সহযোগিতা চেয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ-মিয়ানমারের স্থল সীমান্তে তিনটি বর্ডার লিয়াজোঁ অফিস স্থাপন হবে। যাতে ছোটখাটো বিষয়গুলো এসব অফিসের মাধ্যমে সমাধান করা যায়।

এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আমরা দেখেছি এখনও রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। আমরা তাদের বলেছি রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা আপনারা বন্ধ করেন। তারা কথা দিয়েছে খুব তাড়াতাড়িই এটা বন্ধ হয়ে যাবে।

বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দীন, সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম ইউনিটের সচিব খোরশেদ আলম, পুলিশের মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ জাবেদ পটোয়ারী, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন, কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক আওরঙ্গজেব চৌধুরী, বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের মহাপরিচালক মাসুদ রেজওয়ান, ডিজিএফআইর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাইফুল আবেদীন, পুলিশের বিশেষ শাখার অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক শহীদুল ইসলাম, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দিন আহমদে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সামছুর রহমান, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিভাগের মহাপরিচালক মঞ্জুরুল করিম চৌধুরী, মিয়ানমারে বাংলাদেশ দূতাবাসের ডিফেন্স অ্যাটাচি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাশেদুল মান্নান, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক এম মনিরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে সে দেশের স্বরাষ্ট্র সচিব উ টিন মিন্ট, পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থো, পুলিশ প্রধান মেজর জেনারেল অং ইউন অ, বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত লইন অ-সহ ১৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য করুন

comments