চলতি বছর বন্যায় ক্ষতির পরিমান ১৫ হাজার কোটি টাকা

29
শেয়ার
ছবিঃ সংগৃহিত

হাওরে আগাম বন্যা ও ৩২ জেলায় মৌসুমি বন্যায় মোট ১৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)।

সংস্টটির এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই হিসাবে হাওর এলাকার বোরো ফসল এবং অন্যান্য বন্যাদুর্গত এলাকার বাড়িঘর, সড়ক, কালভার্ট ও বাঁধের ক্ষতিও ধরা হয়েছে। এর বাইরে আরও অনেক ক্ষতি হলেও পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে তা হিসাবে আনা যায়নি।

বৃহস্পতিবার সিপিডি ‘বন্যা ২০১৭ : পরিস্থিতি ও করণীয়’ শীর্ষক এক সংলাপ অনুষ্ঠানে এ বছরের ক্ষতির এ চিত্র তুলে ধরে। একই সঙ্গে ত্রাণ, বন্যা-পরবর্তী করণীয় নিয়ে সুপারিশ এসেছে সিপিডির পক্ষ থেকে। সংস্থাটির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।

কৃষি অর্থনীতিবিদ মো. আসাদুজ্জামান, পানি বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত, পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মাহফুজুর রহমান, কৃষি সম্প্রাসারণ অধিদফতরের পরিচালক হানিফ মোহাম্মদ, ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের অধ্যাপক গহর নঈম, সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার কৃষক মিয়া হোসেন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষক জাফর সাদিক ও ইশতিয়াক বারী।

অনুষ্ঠানে বক্তারা আগামীতে বন্যা প্রতিরোধে নদী ড্রেজিং করা এবং বাঁধ নির্মাণের পর তার যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি বন্যার ক্ষতি সংস্থানে আগামীতে অর্থ লুটপাটের আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। যদিও পানিসম্পদমন্ত্রী বলেছেন, বড় জোর লুট হতে পারে, কিন্তু হরিলুট হবে না। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ মাত্র ৪২০ কোটি টাকা। এ অর্থ থেকে হরিলুট হওয়ার কিছু নেই। তবে বাঁধ ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণে বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

সিপিডি হাওরাঞ্চলে মার্চ-এপ্রিলে হওয়া বন্যার ফলে বোরো ফসলের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, শুধু সেই হিসাব করেছে। তাদের হিসাবে হাওরের ছয় জেলায় আগাম বন্যায় ১০ লাখ ৩১ হাজার ৪০৫ পরিবারের ৪৬ লাখ ৬৭ হাজার ৬২৩ জন আক্রান্ত হয়েছে। এতে ১৫ দশমিক ৮ লাখ টন বোরো ধানের উৎপাদন কম হয়েছে, যা বোরো ধানের মোট উৎপাদনের ৮ দশমিক ৩ শতাংশ এবং হাওরাঞ্চলের মোট উৎপাদনের ৫২ দশমিক ২ শতাংশ। এর আর্থিক মহৃল্য ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, যা সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনের ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।

এর পাশাপাশি হাওর এলাকায় ৪৬০ হেক্টর জমির শাক-সবজি নষ্ট হয়েছে। এ অঞ্চলে ফসলের পাশাপাশি জীবনহানি, ঘরবাড়ি ও পশুসম্পদের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে সড়ক, বাঁধ ও কালভার্টের মতো অবকাঠামোর। তবে তথ্য ঘাটতির অভাবে এই ক্ষতির আর্থিক হিসাব করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে আগের মৌসুমি বন্যায় দেশের ৩২ জেলার ৮২ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। এসব জেলার রোপা আমনের ৯ ভাগ জমি বন্যায় তলিয়ে যায়। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা। তবে তলিয়ে যাওয়া জমির ৮০ ভাগে পুনরায় রোপণ করা গেলে ক্ষতি কমে ৭০০ কোটিতে নামবে। আর ৪০ ভাগে পুনরায় রোপণ করা গেলে ক্ষতি হবে ১৮০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া আগস্টের বন্যায় সড়ক, কালভার্ট ও বাঁধের যে ক্ষতি হয়েছে তার আর্থিক মূল্য চার হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

বন্যাদুর্গত এলাকায় বাড়িঘরের যে ক্ষতি হয়েছে, তার আর্থিক পরিমাণ দুই হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ৩২ জেলায় আগস্টের বন্যায় চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জিডিপির দশমিক ৩৫ শতাংশ থেকে দশমিক ৪৪ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, মৎস্য, পায়খানা, টিউবওয়েলের ক্ষতি হলেও তা হিসাব করেনি সিপিডি।

সংস্থাটি বলছে, সারাদেশে বন্যাদুর্গত অধিকাংশ মানুষকে এখন কিনে খেতে হচ্ছে। এতে তাদের অতিরিক্ত ব্যয় বাবদ কত ক্ষতি হচ্ছে, তাও এ গবেষণায় যোগ করা হয়নি।

গবেষণায় বন্যার্তরা কী পরিমাণ ত্রাণ পেয়েছে, তার হিসাবও করা হয়েছে। সিপিডি বলছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকলেও মাঠ প্রশাসনের সক্ষমতার অভাবে সবার কাছে ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এমনকি দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছেনি। আবার যেসব এলাকায় কম লোক আক্রান্ত হয়েছে, সেখানেও ত্রাণ গেছে কম। তবে ত্রাণ বিতরণ কার্যত্রক্রম সময়মতো শুরু হয়েছিল। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, হাওরাঞ্চলের জন্য ত্রাণ হিসেবে চার হাজার ৫৪৪ টন চাল বরাদ্দ থাকলেও তিন হাজার ২৮৭ টন বিতরণ হয়েছে। নগদ টাকার বেলায়ও একই চিত্র। বরাদ্দ ছিল ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা, সেখানে বিতরণ হয়েছে এক কোটি ৯০ লাখ টাকা।

একই অবস্থা মৌসুমি বন্যায় আক্রান্ত ৩২ জেলায়। এসব জেলায় ২৭ হাজার ২০৭ টন চাল বরাদ্দ থাকলেও বিতরণ হয়েছে ১৭ হাজার ৭২১ টন। আর ৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার মধ্যে বিতরণ হয়েছে ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এসব এলাকায় ৩১ হাজার ৯৮০ বান্ডেল টিন বিতরণ করা হয়েছে। ত্রাণ বিতরণে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করার ক্ষেত্রে অনিয়মের পুরনো অভিযোগ পেয়েছে সিপিডি। সংস্থাটি বলছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা সুবিধা পায়নি। আবার কেউ কেউ একাধিকবারও পেয়েছে।

মন্তব্য করুন

comments