রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি কার্ড’ নিতে বাধ্য করছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী

40
শেয়ার

রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি কার্ড’ নিতে বাধ্য করছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। রাখাইনের পাড়ায় পাড়ায় ঢুকে রোহিঙ্গাদের এ কার্ড জোর করে ধরিয়ে দিচ্ছে। আর এতে অস্বীকৃতি জানালে হত্যা ও দেশ ছেড়ে যাওয়ারও হুমকি দিচ্ছে তারা।রোহিঙ্গারা জানান, নতুন করে হিংসাত্মক আচরণের কারণে বুচদিং এর ১৪টি গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। যে কারণে তারা দলে দলে এপারে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছেন।

আরাকানের বুছিদং এলাকার রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে জোর করে বাঙালী বলে কার্ড নিতে বাধ্য করা এবং তাদের খাবার সংকটের কারণে এতদিন ধরে ওখানে খেয়ে না খেয়ে অবস্থান করা রোহিঙ্গারা এখন পালিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে বলে জানান এই পারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা।

গতকাল মঙ্গলবার টেকনাফ লেদা রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের প্রধান সড়কের পাশে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে এসব কথা জানান মোহাম্মদ মুছা আলী (৫০)। তার বাড়ি মিয়ানমার বুচিডং টাউনশিপের সাংগুবাইন গ্রামে।

তিনি বলেন, মৃত্যুর ভয়ে কার্ড নেওয়ার সম্মতি জানালে সেনাবাহিনী চলে যায়। তবে আমরা বুঝতে পেরেছি, এটা সেনাবাহিনীর নতুন ষড়যন্ত্র। তাদের ভয়ে গ্রামের লোকজন বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে।

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নাগরিক বুঝিদং নয়ংশপাড়া গ্রামের মাদরাসা শিক্ষক হাফেজ ফয়েজ উল্লাহ (৪৮) জানান, তিনি নয়াপাড়া হাফেজিয়া মাদরাসার শিক্ষকতা করতেন। কয়েকদিন থেকে মিয়ানমারের সেনা ও রাখাইন সন্ত্রাসী যুবকেরা মাদরাসাটি দখল করে সেখানে ক্যাম্প করেছে।

হাফেজ ফয়েজ জানান, ওই ক্যাম্পে রোহিঙ্গা লোকজনদের ডেকে এনে বর্মী ভাষায় বাঙালী লেখা কার্ড নেয়ার জন্য জোর জবরদস্তি করছে। সেনাবাহিনীর নয়া কৌশল অনুমান করতে পেরে শিক্ষিত রোহিঙ্গারা এসব কার্ড গ্রহণ করছেনা। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বর্মী সেনারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে গরু, ছাগল, হাস, মুরগি, ধান, চাল লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। ঘরবাড়ী আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে এবং মেরে ফেলার হুমকি প্রদর্শনের মত হিংসাত্মক আচরণে বুচদিং এর ১৪টি গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। যে কারণে রোহিঙ্গারা দলে দলে এপারে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে।

দেড় মাস ধরে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ দিন দিন বাড়ছে। তাদের মধ্যে অনেকেই আহত ও অসুস্থ। সদ্য বাংলাদেশে আসা বুচিডং টাউনশিপের সাংগুবাইন গ্রামের মাস্টার মোহাম্মদ আনোয়ার (৩৫) জানান, তার গ্রামে প্রায় দেড় হাজার ঘরবাড়ি রয়েছে। ১৫ দিন আগে সেখানে সেনাবাহিনী হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকটি ঘরবাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে দেয়। এ সময় এলাকার ২০ জনের মতো যুবককে ধরে নিয়ে যায়।

তিনি জানান, গত শনিবার সেনাবাহিনী ও রাখাইনদের একটি দল গ্রামে ঢুকে সবাইকে বড় একটি গাছের নিচে বসিয়ে রাখে। তারা সবার উদ্দেশে বলে- এখানে থাকলে হলে বাঙালি লেখা কার্ড নিতে হবে, না হলে সবার ঘরবাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। যে কার্ড নেবে, তার কিছুই হবে না। এ কার্ড যে নেবে না তাদের পরিণতি ভালো হবে না বলে হুমকি দেয় তারা।

গতকাল স্বামী ও চার সন্তান নিয়ে শাহপরীর দ্বীপ পয়েন্ট দিয়ে এপারে আসেন ইয়াছমিন আক্তার নামে এক রোহিঙ্গা নারী। তিনি জানান, মিয়ানমার সেনারা এখন মারধর না করলেও বাড়িঘরের মালপত্র লুটপাট চালাচ্ছে। ফলে খাবারের অভাবে রোহিঙ্গারা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। অধিকাংশ বাজার বন্ধ, ত্রাণকর্মীদেরও সেখানে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।

টেকনাফ লেদা রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের নেতা আবদুল মতলব বলেন, মিয়ানমার সেনারা রোহিঙ্গাদের অনেক আগে থেকেই বাঙালি বানানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল, যা এখনও অব্যাহত রেখেছে। এখন মিয়ানমারে রয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের গুলির ভয় দেখিয়ে জোর করে অবৈধ বাঙালি লেখা কার্ড নিতে বাধ্য করছে। তাই আবারও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বেড়ে গেছে।

মন্তব্য করুন

comments