‘রোহিঙ্গা রাজ্য’ কক্সবাজার;নিজ দেশেই পরাভূম হয়ে পড়ছে উখিয়া-টেকনাফের মানুষ

76
শেয়ার

গত ২৪ আগস্ট থেকে মিয়ানমারে সহিংসতার মুখে সেখান থেকে পালিয়ে এসে পাঁচ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে বলে ইউএনএইচসিআরের সূত্রে জানা গেছে। আরো পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা আছে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায়।এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে পুরো কক্সবাজার টেকনাফ জিইয়ে রয়েছে মিয়ানমার থেকে জীবন বাঁচাতে সীমান্ত অতিক্রম করে আসা রোহিঙ্গারা।সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে আসা রোহিঙ্গারা স্থানীয়দের জন্য এটি একটি বিষফোঁড়ার মতো হয়ে আছে।

ইউএনএইচসিআর এর সূত্রমতে, প্রায় চারদশক ধরে নির্যাতনে শিকার হয়ে মিয়ানমারের নিজ ভূমি ছেড়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। ১৯৭৮, ১৯৯১, ১৯৯২, ১৯৯৪ ও ২০১৬ সালে পাঁচদফায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।সর্বশেষ ২০১৭ সালের চলমান পরিস্থিতিতে গত ১৬ দিনে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় প্রায় ৩ লাখ (জাতিসংঘের তথ্যমতে) রোহিঙ্গা। যদিও স্থানীয়দের মতে, এ পর্যন্ত এসেছে ৫ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আরও প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা ঢুকে টেকনাফ ও উখিয়ায়। সে হিসেবে বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা আছে উখিয়া-টেকনাফ উপজেলায়। উখিয়া-টেকনাফের বাইরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আরও লক্ষাধিক রোহিঙ্গা।ফলে নিজ দেশেই এখন আস্তে আস্তে পরাভূম হয়ে পড়ছে উখিয়া-টেকনাফের মানুষ।

১৯৯১ সালে উখিয়ায় কয়েকশ একর পাহাড় কেটে ১৫ হাজার রোহিঙ্গাকে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। এরপর এই শিবিরের দক্ষিণ পশ্চিম পাশে কয়েক হাজার একর সংরক্ষিত পাহাড় কেটে ১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়া হয়েছে। টেকনাফে ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে ২০১২ সালেই আশ্রয় দেয়া হয়েছে।

এবারো যে বিপুল সংখ্যাক রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে তারা এখানেই ফের বন বিভাগের বন ও পাহাড় দখল করে বসতি স্থাপন করে নিয়েছে।ইতিমধ্যে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী আশ্রয়ের জন্য পাঁচ হাজার একর জমি বরাদ্দের পরিকল্পনা করছে সরকার। জেলার কুতুপালং এলাকায় এ জায়গা বরাদ্দ দেয়া হতে পারে।
বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দাদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।এতে সংখ্যার বিচারে এই এলাকাতে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছেন উখিয়া-টেকনাফের বাসিন্দারা।

স্থানীয়রা জানান, রোহিঙ্গাদের কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা বর্তমানে হুমকির সম্মুখীন। ইতোমধ্যে তাদের কারণে সারা দেশে উগ্র জঙ্গি তৎপরতা, ইয়াবা ও মানব পাচারসহ নানা অপরাধ ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিরোধে স্থানীয়ভাবে জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ সরকার এর বোধগম্য করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের দাবি অবিলম্বে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধে সীমান্ত সিল করা, রোহিঙ্গাদের মানবতার নামে অনুপ্রবেশে উৎসাহ প্রদানকারী কতিপয় দেশি-বিদেশি এনজিও এবং ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।

বর্তমানে এরা শুধু কক্সবাজার অঞ্চলেই নয়, বৃহত্তর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। রোহিঙ্গাদের ভাষা, চেহারা, চালচলন, আচার ব্যবহার, খাদ্যাভাসসহ প্রায় সব কিছুর সঙ্গে মিল রয়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিশাল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে। ফলে এদের শনাক্ত করাও এখন কঠিন এক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়ই বলা হয়ে থাকে, তারা তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেবে। আবার কখনও কখনও রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিক নয় বলেও বলা হয়ে থাকে।কখনও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার হয়ে, কখনও সে দেশের সামরিক জান্তার দমন–নিপীড়নে উপায়ান্তর না দেখে আবার কখনও ভাগ্যান্বেষণে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের লোকজন ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেই চলেছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, সরকার এ বিষয়কে গুরুত্ব সহকারে দেখছে। বর্তমান সরকার দ্বি-পাক্ষিক ভিত্তিতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কার্যক্রম আবারও শুরু করবে।

তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসের জন্য সরকারের সাথে জাতিসংঘ দায়িত্ব পালন করছে। এখনও পর্যন্ত মিয়ানমার সরকার এ ব্যাপারে তেমন কোনো মতামত দিচ্ছে না। যদি তাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার সরকার মতামত দেয় তাহলে দ্রুতই প্রত্যাবাসন করা হবে।

এছাড়া তিনি বলেন, মিয়ানমারে সহিংসতাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে অনেক রোহিঙ্গা উখিয়া ও টেকনাফে ঢুকে পড়েছে। তাদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় স্থান করে দেয়ার জন্য ব্যবস্থা চলছে।

ছোট ছোট বাচ্চা, মহিলা, বৃদ্ধদের আমরা মৃত্যুমুখে ফেলে দিতে পারি না। তাদের আশ্রয় দিতে হবে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের জিহাদী সশস্ত্র আন্দোলন এই মুহূর্তে বার্মিজদের কাছে অখণ্ডতার জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ বলে মনে হচ্ছে। বার্মিজরা রোহিঙ্গাদের কোনভাবেই বিশ্বাস করছে না। এমনকি বক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়া স্থানীয় বাসিন্দাদেরও একই ভয়।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর এই জাতিগত নিপীড়ন চলে আসছে কয়েক দশক ধরে।মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত এসব রোহিঙ্গাদের ব্যপারে কোন সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে এ দেশে রোহিঙ্গাদের নিয়ে সমস্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা অনুমান করাও মুশকিল।

মন্তব্য করুন

comments