বঙ্গবন্ধুকে আগেই সতর্ক করেছিলেন ইন্দিরা ও ফিদেল ক্যাস্ত্রো

369
শেয়ার

বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কম করেনি পাকিস্তানিরা। গ্রেপ্তার, নির্যাতন কোনো কিছুই বঙ্গবন্ধুকে টলাতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় সারাক্ষণ ছিল বাংলাদেশের মানুষ, তাঁর মানুষ।

নিজের মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাস এতই দৃঢ় ছিল যে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র হচ্ছে এমন পূর্বাভাস পেয়েও তা উড়িয়ে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার বিরুদ্ধে হত্যা ষড়যন্ত্রের বিষয়ে অনেক আগেই সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ত্রো।

বাংলাদেশের ভেতর ও বাইরে বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে দেয়ার চক্রান্ত চলছে বলে তারা দুজনেই একাধিকবার বার্তা দিয়েছিলেন। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের সেই সতর্কবার্তাকে কখনোই গুরুত্ব দেননি। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নৃশংস হত্যাকা-ের শিকার হন তিনি।

ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স উইং, ‘র’ এর পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। ভারতীয় সাংবাদিক সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত তার মুজিব হত্যার ষড়যন্ত্র বইয়ে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার আগাম পূর্বাভাসের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ঐতিহাসিক বন্ধন গড়ে উঠে। সে সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যেও গভীর বন্ধুত্ব হয়। বঙ্গবন্ধু নিহতের অনেক আগেই ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের খবর জানিয়ে তাকে সতর্ক করেছিলেন।

বিশেষ করে ১৯৭৪ সালের মে মাসে ৫ দিন ভারত সফরে বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সেই সময়ে ভারত সফরের মধ্য দিয়ে তখন উভয় দেশের মধ্যে মৈত্রীর সম্পর্ক আরও জোরালো হয়। ইন্দিরা গান্ধী খুব স্পষ্ট ভাষায় শেখ মুজিবকে একাধিকবার জানিয়েছিলেন, তার (শেখ মুজিব) বিরুদ্ধে একটি চক্রান্ত চলছে। কিন্তু শেখ মুজিব এই সতর্কবার্তা গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেননি।

১৯৭৭ সালে এক সাক্ষাতকারে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে আমরাও তা জানতাম। মুজিবকে আমি এ-সম্পর্কে বহুবার সতর্ক করে দেই। কিন্তু তিনি বরাবর আমাকে বুঝিয়েছেন, পাকিস্তানের জেল থেকেই যখন বেরিয়ে আসতে পেরেছি, নিজের দেশের জল্লাদকে নিশ্চয়ই এড়াতে পারব।’

ছবিঃ সংগৃহিত

ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক এ এল খতিব তার ‘হু কিলড মুজিব’ বইয়ে লিখেছেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেখ মুজিব প্রায়ই বলতেন, ‘একটি বুলেট আমাকে তাড়া করে ফিরছে’। কিন্তু তিনি মৃত্যুভয়ে ভীত ছিলেন না। একজন মানুষ যদি মৃত্যুভয়ে ভীত থাকে তাহলে তার মর্যাদা থাকে কোথায়। মুজিবকে তার দেশের মানুষের কাছে খোলামেলাভাবেই মিশতে হতো। ‘আমার জনগণ আমাকে ভালোবাসে’। এ কথাটি মুজিব বহুবার এমনভাবে বলতেন যেন এটি একটি মন্ত্র, যা তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করবে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চিকিৎসার কারণে মস্কো গিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালের ১০ এপ্রিল মস্কো থেকে ফেরার পথে দিল্লীতে ১৬ ঘণ্টা যাত্রাবিরতি করেন। তার একদিন আগেই ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধী বিচারে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছিল। এক মাস পরই মে মাসে ৫ দিন ভারত সফরে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সে সময়ে বাংলাদেশে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে বলে সতর্কবার্তা দেয়া হয়।

এদিকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ত্রোর। ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে আলজেরিয়ায় জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে যোগ দেয়ার সময় কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ত্রোর সঙ্গে এক বৈঠক হয়। বঙ্গবন্ধুকে চিলির প্রেসিডেন্ট সালভেদর আলেন্দের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ফিদেল ক্যাস্ত্রো জানিয়েছিলেন, ‘সিআইএ সম্পর্কে সাবধান। সুযোগ পেলেই তারা আপনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। আর আপনি যদি আপনার শত্রুদের দমন করতে না পারেন, তাহলে ওরাই আপনাকে সরিয়ে দেবে।’ তবে ক্যাস্ত্রোর কথার প্রতি উত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘পরিণতি যাই হোক, আমি আপস করবো না।’

বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে ১৯৮৯ সালে ভারতের সানডে পত্রিকায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ প্রধান রামেশ্বর নাথ লিখেছিলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাণনাশে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল সদস্যের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আমরা আগাম তথ্য পেয়েছিলাম। আমি বিষয়টি নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কথা বলি। তাঁকে আমরা বলি যে, এ সংক্রান্ত তথ্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম সূত্র থেকে আমরা জানতে পেরেছি। এসব সূত্রের পরিচয় যেকোনো মূল্যে গোপন রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে আমি ঢাকা সফর করেছিলাম।

শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমার শেষ বৈঠকের এক পর্যায়ে আমি তাঁকে বঙ্গভবনের [সম্ভবত গণভবন] বাগানে একান্তে কিছু সময় দেওয়ার জন্য অনুরোধ করি। সেখানে আমি তাঁর প্রাণনাশের আশঙ্কা নিয়ে আমাদের জানা তথ্য তাঁকে অবহিত করি। কিন্তু তিনি উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বাহু দুলিয়ে বলেন,‘তারা আমার নিজের সন্তান, তারা আমার ক্ষতি করবে না’। আমি তাঁর সঙ্গে তর্কে যাইনি। শুধু এটুকু বলেছিলাম, এসব তথ্য নির্ভরযোগ্য এবং ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আমরা যা জানতে পেরেছি তা আমরা তাঁকে অবহিত করব।

এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের মার্চে আমি আমাদের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ঢাকায় পাঠিয়েছিলাম। তিনি শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এবং তাঁকে অবহিত করেছিলেন যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পদাতিক ও অশ্বারোহী ইউনিট তাঁর প্রাণনাশের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত শেখ মুজিব এসব সতর্কতা অগ্রাহ্য করেছিলেন।’

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহতের ঘটনা জানতে পেরে শোকাহত হয়েছিলেন ফিদেল ক্যাস্ত্রো। তিনি বঙ্গবন্ধুর হত্যার খবরের পর প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছিলেন, ‘শেখ মুজিবের মৃত্যুতে সারা বিশ্বের শোষিত মানুষ হারালো তাদের এমন একজন মহান নেতাকে, আর আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে।’

মন্তব্য করুন

comments