বাংলাদেশ থেকে ১৫০ কোটি টাকা মূল্যের উচ্চ প্রযুক্তির জাহাজ রপ্তানি জাহাজটিতে রয়েছে হেলিপ্যাড

161
শেয়ার
ছবিঃ সংগৃহিত

দেশের দ্রুত বর্ধনশীল শিল্প খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম জাহাজ নির্মাণশিল্প। দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে এখানকার তৈরি জাহাজ। এবার কেনিয়ায় রপ্তানির জন্য চট্টগ্রামের ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডে প্রায় দেড় শ কোটি টাকা রপ্তানিমূল্যের একটি উচ্চপ্রযুক্তির জাহাজ নির্মাণ করা হয়েছে।

গতকাল রোববার দুপুরে কর্ণফুলী এক নম্বর ঘাটে জাহাজটির ‘ইয়ার্ড ডেলিভারি’ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। শাহ আমানত সেতুর উজানে কর্ণফুলী নদীতে নোঙর করে রাখা জাহাজটির সামনে একটি বার্জের ওপর দাঁড়িয়ে ফিতা কেটে এটি উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী।

অফশোর পেট্রোল ভেসেল’ হিসেবে পরিচিত বিশেষায়িত এই জাহাজটির নাম ‘দরিয়া’। ছোট আকারের হলেও জাহাজটির রপ্তানি মূল্য ১৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। ২০১৪ সালের আগস্টে নির্মাণ শুরু হওয়া জাহাজটি এ মাসেই কেনিয়ার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম বন্দর ছাড়বে। এটি রপ্তানির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো উচ্চপ্রযুক্তির জাহাজ নির্মাণের বাজারে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

ডেনর্মাকের জেজিএইচ মেরিন এ/এস কোম্পানির মাধ্যমে এটি কেনিয়ার মৎস্য মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হবে। জাহাজটি মূলত কেনিয়ার সমুদ্র এলাকায় মাছ ধরার ট্রলারগুলোতে নিরাপত্তা তদারকিতে ব্যবহৃত হবে।

জাহাজটি ঘণ্টায় চলবে ৩৬ নটিক্যাল মাইল গতিতে। সড়কের গতির সঙ্গে তুলনা করলে এই গতিবেগ দাঁড়ায় ঘণ্টায় প্রায় ৬৫ কিলোমিটার। সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজের ঘণ্টায় গতিবেগ থাকে ১২ নটিক্যাল মাইল। এই জাহাজে রয়েছে দ্রুতগতির ‘ওয়াটারজেট’ ইঞ্জিন। মূল ইঞ্জিনসহ ইঞ্জিনের ক্ষমতা ১০ হাজার ৭২০ কিলোওয়াট। জাহাজটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৪ মিটার। প্রস্থ সাড়ে ৮ মিটার। এতে ৩৬ জন নাবিকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘জাহাজ নির্মাণশিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর। অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ সেক্টর ভূমিকা রাখছে। লেদার ও টেক্সটাইল শিল্পের মতো জাহাজ নির্মাণ শিল্প এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা আর পেছনে ফিরে যেতে চাই না। সরকার এ খাতে ভর্তুকীসহ অন্যান্য সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘জাহাজ নির্মাণের ঐতিহ্য ছিল আমাদের। সেই গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য আবার ফিরে এসেছে। ওয়েস্টার্ন মেরিন এখন দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য ৩৫টি জাহাজ নির্মাণ করছে, যা গৌরবের।’

অনুষ্ঠানে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের চেয়ারম্যান সায়ফুল ইসলাম বলেন, মন্দার কারণে বিশ্বের জাহাজনির্মাণ শিল্পে অস্থিরতা চলছে। সারা বিশ্বের ৩০ শতাংশ জাহাজনির্মাণ প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে গেছে। সেখানে ওয়েস্টার্ন মেরিন এখন অনেক জাহাজ তৈরি করছে। শ্রমঘন, পুঁজিঘন, উচ্চপ্রযুক্তির ও ভারী এই শিল্পকে দীর্ঘ মেয়াদে নীতি সহায়তা দেওয়া দরকার।

ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এই জাহাজটি নির্মাণে বিশ্বের ২৫টি দেশ থেকে উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়েছে। জাহাজে যেসব তার ব্যবহার করা হয়েছে তা লম্বালম্বিভাবে রাখা হলে দৈর্ঘ্য হবে ৪০ কিলোমিটার। জাহাজটিতে রয়েছে হেলিপ্যাড। জাহাজটি নির্মাণের সময় মান তদারকি করেছে ফ্রান্সভিত্তিক ব্যুরো ভেরিতাস।

জাহাজ হস্তান্তর অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন- নৌ মন্ত্রণালয়ের সচিব অশোক মাধব রায়, ওয়েস্টার্ন মেরিনের কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম, চট্টগ্রামের নেভাল এরিয়ার কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল এম আশরাফুল হক, ব্যাংক এশিয়ার কর্মকর্তা এসএম ইকবাল হোসেন, কেনিয়ার মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের ক্যাবিনেট ও প্রধান সচিবসহ ওয়েস্টার্ন মেরিনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

উল্লেখ্য, ওয়েস্টার্ন মেরিন যাত্রা শুরু করেছিল ২০০০ সালের ১১ জুলাই। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ওয়েস্টার্ন মেরিন এ পর্যন্ত ১৪০টি জাহাজ সরবরাহ করেছে। এতে আয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশের বাইরে রপ্তানি করা হয়েছে ২৫টি। বাকি ১১৫টি জাহাজ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য সরবরাহ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির কাছে বর্তমানে আরো ৩১টি জাহাজ নির্মাণের জন্য আদেশ রয়েছে। এসব জাহাজের মধ্যে দেশের প্রাইভেট কোম্পানির জন্য ২০টি, নরওয়ের জন্য ১টি, চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য ১টি, পায়রা বন্দরের জন্য ১টি, বিআইডব্লিউটিসি’র জন্য ২টি, বাংলাদেশ আর্মির জন্য ১টি এবং ৪টি কনটেইনার জাহাজ বাংলাদেশের প্রাইভেট সেক্টরের জন্য নির্মাণ করা হবে।

মন্তব্য করুন

comments