আগামী মাসে শুরু হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের কাজ

1145
শেয়ার
ছবিঃ সংগৃহিত

অবশেষে বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে বহুল প্রতিক্ষিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ। রেল যোগাযোগকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার, পর্যায়ক্রমে ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের কাজ বর্ষা শেষে সেপ্টেম্বর-অক্টোরব মাসে শুরু হচ্ছে।

১২৮ কিমি দীর্ঘ এই রেলপথ নির্মাণে ১৫০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা দিচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি)। প্রথম কিস্তির ৩০০ মিলিয়ন ডলার প্রদানের জন্য গত মাসের ২১ তারিখ এডিবি ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অধীনে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন।

এ প্রকল্পের কাজ ২০২২ সাল নাগাদ শেষ হবে। রেলওয়ে কর্মকর্তারা আশা করছেন, ২০২০ সালের শুরুতেই পুরোপুরি চালু হবে প্রথম পর্যায়ের চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলযোগাযোগ।

প্রথম পর্যায়ে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী হয়ে রামু-কক্সবাজার পর্যন্ত ১০২ কিলোমিটার বাস্তবায়ন হবে। মোট ১০২ কিলোমিটার রেললাইনের মধ্যে চট্টগ্রাম-দোহাজারি ৪৭ কিলোমিটার রাস্তা সরকারের অর্থায়নে তৈরি করা হবে। এ রেল লাইন চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সংযোগ করবে এবং সর্বশেষ মিয়ানমারের সাথে যুক্ত হবে।

প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান জানান, ১২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথ ও অবকাঠামোসহ নির্মাণ কাজে ভিন্নতা রয়েছে। পাহাড় ও আঁকা-বাঁকা পথে রেললাইন নির্মাণ হচ্ছে। অগ্রাধিকার ও দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের ১০টি মেগা প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এ প্রকল্পটি। এরই ধারাবাহিকতায় চলছে জমি অধিগ্রহণ এবং এ্যালাইনমেন্ট চূড়ান্ত পর্যায়ে।

জমি অধিগ্রহণের জন্য ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসককে ২২৫০ কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের টাকা দিয়েছে সরকার এবং মূল প্রকল্পের টাকা দিচ্ছে এডিবি। মোট চার কিস্তিতে এই ১৫০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা দেবে বলে জানা গেছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, বর্ষার শেষ হলেই রেল স্টেশন ও দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইনের নির্মাণ কাজ শুরু হতে পারে। প্রথমে রেললাইন নির্মাণ হবে চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু পর্যন্ত। রামুতেই হবে জংশন। আর সেখান থেকে একটি রেললাইন যাবে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে। তখন ঢাকা থেকে সরাসরি ট্রেনে পৌঁছা যাবে কক্সবাজারে।

প্রথম ভাগে দোহাজারী থেকে চকরিয়া পর্যন্ত ট্র্যাক নির্মাণ, রেলের সিগন্যালিং ও টেলি কমিউনিকেশন কাজ করা হবে। পরে চকরিয়া থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ট্র্যাক নির্মাণ এবং কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক মানের রেল স্টেশন নির্মাণ করা হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটক আকর্ষণ করার জন্যেই সেখানে আইকনিক ইন্টারন্যাশনাল রেল স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ঝিনুক আকৃতির এ স্টেশন দেখলেই বুঝা যাবে এটি একটি সমুদ্র সৈকতের স্টেশন। উঁচু-নিচু টিলা, বনভূমি, সমতল, সবুজ প্রান্তর পেরিয়ে রেললাইনটি শেষ হবে সমুদ্র তীরের একেবারে নিকটে।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রেল নেটওয়ার্ক ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়েতে যুক্ত হবে বাংলাদেশের রেলপথ। রেলওয়ের নেটকওয়ার্ক মিয়ানমার-বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান-ইরান হয়ে যাবে ইউরোপের তুরস্ক পর্যন্ত। এছাড়া মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, লাওস, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড রেলওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। পরে যশোর, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা হয়ে ভারত যাবে। আর তাতে বাংলাদেশের সঙ্গে তৈরি হবে ২৭টি দেশের রেল নেটওয়ার্ক।

শুরুতে মিটারগেজ হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা ছিল। ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেলপথ মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে মিটারগেজের পরিবর্তে ডুয়েলগেজ নির্মাণের নির্দেশনা দেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে এ উন্নয়ন প্রকল্প শেষ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জানা যায়, এ প্রকল্পে কক্সবাজারসহ ১১টি রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ এবং ৫২টি বড় ও ১৯০টি ছোট সেতু এবং ১১৮টি লেভেলক্রসিং ও ২টি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে।

চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে এই লাইন শুরু হবে। এরপর চন্দনাইশের অল্প অংশ, সাতকানিয়া, লোহাগড়া, চকরিয়া, রামু, কক্সবাজারের ঝিলংজা পর্যন্ত যাবে এই রেললাইন। দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত থাকবে ৯টি রেল স্টেশন। আর এগুলি নির্মিত হবে দোহাজারী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, হারবাং, চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ইসলামাবাদ, রামু ও কক্সবাজার।

সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, প্রকল্পটি পর্যটন শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন হলে পর্যটন খাতে আমূল পরিবর্তন আসবে, বাড়বে রাজস্ব আয়ও। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে হাজার হাজার মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের দ্বার উন্মোচিত হবে।

মন্তব্য করুন

comments