চট্টগ্রামের মেয়ে জেরিনের ফাঁদে ব্যবসায়ী-শিল্পপতি

1291
শেয়ার

বাংলাদেশের একজন উঠতি মডেল। নাম জেরিন খান। বয়স ২০। জন্ম চট্টগ্রামে, স্কুলে কখনো যাননি। তবে তার কথাবার্তা ও আচার-আচরণ দেখে এটি বোঝার উপায় নেই। গত সাড়ে তিন বছরে বাংলাদেশের অন্তত ১১ জন শিল্পপতির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়েছেন তিনি। এরপর ডেকেছেন শ্যামলীর ফ্ল্যাটে। সেখানে আনন্দঘন মুহূর্তে তার ‘বন্ধুরা’ ডিবি সেজে হানা দেন। অস্ত্রের মুখে ব্যবসায়ীকে বাধ্য করেন নগ্ন ছবি তুলতে। পরবর্তী সময়ে সেই ছবি দিয়ে চলতে থাকে প্রতারণার রমরমা ব্যবসা।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে বাড্ডার এক টাইলস ব্যবসায়ীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্তে নেমে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পূর্ব বিভাগ ‘খদ্দের’ সেজে শ্যামলীর গার্ডেন সিটির ২৩/১০ নম্বর বাসার এ-২ নম্বর ফ্ল্যাটে অভিযান চালায় । অভিযানকালে ওই বাসা থেকে চট্টগ্রামের বন্দরটিলা ইপিজেড এলাকার ওয়াহেদুল খানের মেয়ে সুন্দরী মডেল জেরিন খান ওরফে জেরিন খ্রিস্টা (২৩) এবং প্রতারক চক্রের মূল হোতা রেহানা জামান পপিকে (৩৫) গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে অস্ত্র ও ওয়াকিটকিসহ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাজ্জাক হোসেন রাজ, জাকির হোসেন, খসরু ও শহিদুল ইসলামকে গ্রেফতার হয়। এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর ও মতিঝিল থানায় পৃথক মামলা করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ওই দুই নারী জেল হাজতে আটক আছেন। অস্ত্রসহ গ্রেফতার ব্যক্তিদের দুজনকে রিমান্ডে নিয়ে আরও দুজনের নাম পাওয়া যায়। তাদেরও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।

সর্বশেষ গত ৮ ফেব্রুয়ারি ওই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মাধ্যমে নগদ ১২ লাখ টাকা, পাঁচ হাজার ডলার (চার লাখ ২০ হাজার টাকা), দুটি ক্রেডিট কার্ড ছিনিয়ে নেয় চক্রটি।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জেরিন জানিয়েছেন, সুন্দরী মডেলদের দিয়ে ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের ফাঁদে ফেলে তাদের চক্র। এরপর ভুয়া ডিবি পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার ও পরিবারকে জানানোর ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এর মূল হোতা পপি। শ্যামলীর জাপান গার্ডেন সিটিতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে তিন বছর ধরে এই প্রতারণা করে আসছিলেন তারা। তাদের চক্রে শুধু সুন্দরী মডেলরা নন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও আছেন, যারা ভুয়া ডিবি সেজে টাকা আদায় করেন। জেরিন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে হাতানো টাকা রাখতেন ইস্টার্ন ব্যাংকে নিজের অ্যাকাউন্টে।মূলত তাদের প্রধান টার্গেট থাকে বিবাহিত ব্যবসায়ীরা। তারা সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় টাকা দিতে বাধ্য হন।

পুলিশ জানায়, জেরিন খান বাংলাদেশের একজন উঠতি মডেল। হ-য-ব-র-ল নামের একটি নাটকে নীরব খানের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। এরপর নীরবের মাধ্যমে ডিরেক্টর রয়েল খানের সঙ্গে পরিচয়। রয়েল খানই নাকি তাকে দেহ ব্যবসায় আনতে বাধ্য করেছেন- এমনই দাবি জেরিনের।

জেরিন আরও জানান, রয়েলের মাধ্যমে বাংলাদেশের নামীদামি ব্যবসায়ীর সঙ্গে পরিচয় হয় তার। তাদের সঙ্গে কখনো স্পেন, কখনো ব্যাংকক আবার কখনো মালয়েশিয়া ভ্রমণ করেন জেরিন। এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে ভ্রমণের সময়ে প্লেনচলাকালীন ককপিটেও যান জেরিন। প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর অনুরোধে ছবিও তোলেন পাইলটদের সঙ্গে।

গ্রেফতারের কয়েকদিন আগে দেশের অন্যতম বৃহৎ এক শিল্পগোষ্ঠীর মালিকের ছেলের সঙ্গে দেখা করে ২০ হাজার টাকা নেন জেরিন। তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতারও দাবি করেন তিনি। পুলিশকে জেরিন জানান, ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকের ছেলের সঙ্গে অনেক মডেল দেখা করে টাকা আনেন। শারীরিক চাহিদা মেটানোর জন্য মডেলদের নগদ টাকার পাশাপাশি দামি উপহারও দেন ওই শিল্পপতি মালিকের ছেলে।

মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানান, এই চক্রের মূল টার্গেট শিল্পপতি ও রাজনীতিবিদ এবং মোটা বেতনের চাকরিজীবী। তবে শিল্পপতিদের সঙ্গে কোনো প্রতারণা করা হতো না। শিল্পপতিদের সঙ্গে স্বেচ্ছায় বিভিন্ন দেশে ভ্রমণে যেত তারা। বিনিময়ে চক্রের অন্য সদস্যদের আদায় করে দেওয়া হতো মোটা অঙ্কের টাকা।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জেরিন জানিয়েছেন, সুন্দরী মডেলদের দিয়ে ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের ফাঁদে ফেলে তাদের চক্র। এরপর ভুয়া ডিবি পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার ও পরিবারকে জানানোর ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এর মূল হোতা পপি। শ্যামলীর জাপান গার্ডেন সিটিতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে তিন বছর ধরে এই প্রতারণা করে আসছিলেন তারা। তাদের চক্রে শুধু সুন্দরী মডেলরা নন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও আছেন, যারা ভুয়া ডিবি সেজে টাকা আদায় করেন। জেরিন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে হাতানো টাকা রাখতেন ইস্টার্ন ব্যাংকে নিজের অ্যাকাউন্টে। ছয় মাস আগেও শাকিল নামে এক ব্যবসায়ীকে ব্ল্যাকমেইলিংয়ে ফেলে ১২ লাখ টাকা আদায় করেছেন। মূলত তাদের প্রধান টার্গেট থাকে বিবাহিত ব্যবসায়ীরা। তারা সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় টাকা দিতে বাধ্য হন।

তদন্তে ডিবি আরও জানতে পারে, প্রতারণা এ চক্রে জেরিন ছাড়া আরও অনেক মডেল রয়েছেন। তাদের নামের তালিকা তৈরি হচ্ছে। চক্রের অন্যতম সদস্য পপি। জেরিন ব্যবসায়ীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করে শ্যামলীর খিলজি রোডের যে ফ্ল্যাটে নিয়ে যেতেন সেটির মালিক পপি। পপির অধীনে প্রতারণার কাজ করে অসংখ্য মডেল ও ছেলে। চক্রের সুন্দরী মডেলরা ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ, বড় চাকরিজীবীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। এরপর তারা মোবাইল নম্বর আদান-প্রদান করে কথা বলা শুরু করেন। কয়েক দিন কথা বলে তারা বাইরে দেখা করেন এবং ঘুরতে যান। পরে সুযোগ বুঝে নির্ধারিত বাসায় ডেকে আনা হয় টার্গেটে থাকা ব্যক্তিদের। বাসায় কিছু সময় কাটানোর পরই সেখানে হাজির হয় ভুয়া ডিবি চক্রের সদস্যরা। আপত্তিকর মুহূর্তের ছবি তুলে এবং গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। কেড়ে নেওয়া হয় সঙ্গে থাকা বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম কার্ড। পরে টাকা দিতে রাজি না হলে ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া এবং পরিবারকে আপত্তিকর ছবি দেখানোর হুমকি দেওয়া হয়। এভাবেই বছরের পর বছর চলে তাদের প্রতারণা।

মন্তব্য করুন

comments