নির্মম নির্যাতনের শিকার সেই বৃদ্ধা মায়ের দায়িত্ত্ব নিলেন জেলা প্রশাসক এত কিছুর পরেও ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই সেই মায়ের

68
শেয়ার

পাষন্ড ছেলের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার ৯৮ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা আহত মায়ের ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে তা নজরে আসে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের (ডিসি)। সেই মায়ের চিকিৎসার দায়িত্ব নেন জেলা প্রশাসক মোঃ আব্দুল আউয়াল।নির্মম এই ঘটনা শুনে নিজেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বৃদ্ধাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলার আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করার ব্যবস্থা করেছেন এই কর্মকর্তা।

তাসলেমা খাতুন (৯৮) ওই গ্রামের মৃত সফিরউদ্দীনের স্ত্রী।

সন্তান ও বউমার নির্যাতনে রক্তাক্ত বৃদ্ধা তাসলেমা খাতুনকে (৯৮) ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক আব্দুল আওয়াল যখন কোলে করে অ্যাম্বুলেন্সে তুলছিলেন সেই দৃশ্য দেখে এলাকাবাসী নীরব হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। বুধবার সকাল ৭টায় জেলা প্রশাসক ও সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি দেখে হরিপুর উপজেলার ডাঙ্গীপাড়া ইউনিয়নের ডাঙ্গীপাড়া গ্রামের মানুষ অবাক হয়ে যান। এসময় এলাকার অনেক নারী একে অপরকে বলেন, যে কাজ করা দরকার ছিল নিজের ছেলের, সেটা করলেন বড় স্যার (জেলা প্রশাসক)।

জেলা প্রশাসকের উপস্থিতির খবর শুনে সেখানে হরিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ বেগ, ডাঙ্গীপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মনিসহ এলাকার গণ্যমাণ্য ব্যক্তিরা হাজির হন। পরে সবার উপস্থিতিতে তাসলেমা খাতুনকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঠাকুরগাঁওয়ের পথে রওনা হন। এরপর দুপুর ১২টায় তাসলেমা খাতুনকে জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ডাঙ্গীপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মনি জানান, রাতে সংবাদকর্মীদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। সকালে এসে ডিসি স্যার ও দুজন সাংবাদিক বৃদ্ধ মাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঠাকুরগাঁওয়ে নিয়ে যান।

জরুরি বিভাগের ডাক্তার পার্থ সারথী দাস জানান, বৃদ্ধা মায়ের চোখের ক্ষত খুবই গুরুতর। তাকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তার সব চিকিৎসা ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতাল থেকে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. আবু মোহাম্মদ খায়রুল কবির।

জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল আউয়াল জানান, বৃদ্ধা মা সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারেন সেজন্য সবধরনের ব্যবস্থা আমরা সমন্বিতভাবে করবো। এখন তার উন্নত চিকিৎসা হওয়াটা জরুরি। সেটা শুরু হয়েছে।

জানা গেছে, মঙ্গলবার সকালে বৃদ্ধা তাসলেমা খাতুন ক্ষুধার্ত ছিলেন, তখন তিনি বড় ছেলের স্ত্রীর কাছে ভাত খেতে চাইলে তাকে গালিগালাজ করা হয়। পরে তার ছেলে শুনলে তাকে মারধর করে ঘর থেকে বের করে দেয়া হয়। আঘাতে তার বাম চোখের নিচে ফেটে যায়। এছাড়াও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত করা হয়।

স্থানীয়রা জানান, ৩০ বছর আগে বৃদ্ধা তাসলেমা খাতুনের স্বামী মারা যায়। মারা যাওয়ার সময় তার স্বামী দুই ছেলে দুই মেয়ে রেখে যান এবং দুই ছেলের নামে তিন একর ৩০ শতাংশ জমি দলিল দেন। বসতভিটা বড় ছেলের ছেলে (নাতি) চালাকি করে বৃদ্ধা তাসলেমা খাতুনের কাছ থেকে দলিল করে নেয়। বয়সের ভারে ন্যুজ বৃদ্ধা তাসলেমা খাতুন ঠিকমতো চোখে দেখেন। কথাও তেমন বলতে পারেন না।

গণমাধ্যমকর্মীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে জেলা প্রশাসক তার চিকিৎসার জন্য জেলা সিভিল সার্জনের সঙ্গে কথা বলেন। প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার চিন্তা করলেও উন্নত চিকিৎসা জন্য সিভিল সার্জনের পরামর্শে ঠাকুরগাঁও আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সিভিল সার্জন ডা. আবু মোহাম্মদ খায়রুল কবিরের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বৃদ্ধার চিকিৎসা চলছে।

ডা. খায়রুল কবির বলেন,দীর্ঘদিন ধরে ঠিকঠাক খাওয়া দাওয়া ও যত্ন না হওয়ায় বৃদ্ধা অপুষ্টিতে ভুগছেন। সার্বিক বিষয় চিন্তা করে তার চিকিৎসা শুরু করেছি। তাকে একটি কেবিনে রেখে চিকিৎসা দেয়া হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে কেবিনের ভাড়া পরিশোধের কথা বলেছি।

এই ঘটনাকে অমানবিক দাবি করে তিনি বলেন, ‘মায়ের মাতৃত্ব কেমন দেখুন, এত নির্যাতনের পরও এই বৃদ্ধ মহিলা তার সন্তানের বিরুদ্ধে কোনো কিছু বলতে রাজি না।’

জেলা প্রশাসক আক্ষেপ করে বলেন, ‘এই বৃদ্ধার চিকিৎসার পাশাপাশি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য একটা আশ্রয় দরকার। মমতাও দরকার। আমরা সবাই মিলে তাকে মমতার ছোঁয়া দিতে চাই। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, উপজেলা প্রশাসনসহ সবাই এগিয়ে আসছেন। আশা করি আমরা ভালো কিছু করতে পারবো।’

তার জন্য ভাতার ব্যবস্থা করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, বৃদ্ধাকে তার ছেলেরা দেখভাল করছে না। চিন্তা করেছি তার একজন মেয়ে আছে। তাকে আর্থিকভাবে সহায়তা করে মেয়ের কাছে থাকার ব্যবস্থা করার চিন্তা করছি। যদি সেটা সম্ভব না হয় তাহলে ঠাকরগাঁওয়ের সরকারি শিশুসদনগুলোতে থাকার ব্যবস্থা করার চিন্তা করছি। সেখানে তিনি হয়তো ছোট্ট শিশুদের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দে বসবাস করতে পারবেন।’

প্রশাসনের পক্ষ থেকে মায়ের কষ্ট লাঘবের জন্য পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সেই মায়ের একটি মেয়ে রয়েছে আমরা চাইবো প্রতি মাসে মায়ের জন্য এমন একটি ভাতার ব্যবস্থা করতে যাতে করে তার মেয়ে তাকে দেখাশোনা করতে আগ্রহী হয়। আর মেয়ে যদি তাতে রাজি না হয় তাহলে মাকে রাখা হবে সরকারি শিশু পরিবারে। যেখানে মা তার নাতি-নাতনীর বয়সী বাচ্চাদের সঙ্গে থাকবেন। যতোদিন বেঁচে থাকবেন এই মা ততোদিন তার ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবে জেলা প্রশাসন।’

পুলিশ প্রশাসন বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে তদারকি করছে।পাশাপাশি ছেলে বদিরুদ্দিনকে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।

মন্তব্য করুন

comments