কক্সবাজারে হচ্ছে বিদেশী পর্যটকদের জন্য পৃথক ট্যুরিস্ট জোন

99
শেয়ার

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবরাং সৈকতে বিদেশি পর্যটকদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে এক্সক্লুসিভ টুরিস্ট জোন বা বিশেষ পর্যটনপল্লি। এ জন্য ১৩৫ একর সৈকতসহ আশপাশের অতিরিক্ত আরও এক হাজার ১৬৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। কক্সবাজারে বেড়াতে আসা বিদেশি পর্যটকদের জন্য পৃথক ট্যুরিস্ট জোন করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

পর্যটন সুংশ্লিষ্ট আশা করছেন পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে সামনের বছর গুলোতে বাংলাদেশে বিদেশী পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে। বর্তমানে কাঙ্খিত হারে বিদেশি পর্যটক পাচ্ছে না বাংলাদেশ। ফলে বিদেশি পর্যটক বাড়াতে তাদের জন্য ‘বিশেষ জোন’ করার চিন্তা করছে সরকার।

স্পেশাল টুরিস্ট জোনে বিদেশিদের জন্য থাকবে মোটেল, রিসোর্ট, গেমিং জোন, কনভেনশন সেন্টার, সিনেপ্লেক্স, ফুড কোর্ট, বিচ ট্যুর অপারেটর। উড়োজাহাজে করে বিদেশি পর্যটকরা কক্সবাজার বিমানবন্দরে নেমে এরপর শাটল ট্রেনে সরাসরি সাবরাং যেতে পারবেন। এজন্য বিদেশি বিনিয়োগকারী খোঁজা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পর্যটন করপোরেশন।

২০১৮ সালের মধ্যে দেশে বিদেশী পর্যটকের সংখ্যা ১০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। ‘ভিজিট বাংলাদেশ’ নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। পর্যটন কর্পোরেশনের তথ্য অনুসারে, কক্সবাজারের সাবরাং অঞ্চলে ১০০ একর জায়গা নিয়ে তৈরি করা হবে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন। এটি করা হবে শুধু বিদেশি পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে। সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে এই প্রকল্পে বড় অংকের অর্থও বরাদ্দ দেওয়া হবে।

দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যাও বেড়েছে। আমাদের দেশে এখন বেশকিছু ট্যুর অপারেটর রয়েছে। তবে দায়িত্বশীল ট্যুর অপারেটর গড়ে উঠেনি। পর্যটন করপোরেশন শুধু নীতি-নির্ধারণ করবে। এগুলো কার্যকর করবে পর্যটন বোর্ড।

পর্যটক বাড়তে বিদেশি ট্যুর অপারেটরও পরিচিতিমূলক ভ্রমণে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যাতে বাংলাদেশের ট্যুর অপারেটররা বিদেশি ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন। অন অ্যারাইভাল ভিসার পরিধি বাড়িয়ে আরও কয়েকটি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

বর্তমানে কক্সবাজার, কলাতলী, ইনানী ও টেকনাফ সৈকতে বিদেশিরা নামতে পারেন না। ভিক্ষার জন্য শিশুরা পিছু লেগে থাকে। গোসলের সময় স্থানীয় ব্যক্তিরা ঘিরে ধরে। এতে বিরক্ত বোধ করেন বিদেশিরা। এ কারণে সাবরাং বিশেষ পর্যটনপল্লি গড়ে তোলা হচ্ছে। এখানে সাধারণের যাতায়াত সংরক্ষিত থাকবে। তবে নিয়মকানুন মেনে স্থানীয় ব্যক্তিদের সেখানে ঢোকার সুযোগ রাখা যেতে পারে।

পর্যটন করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, বিদেশি পর্যটকদের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যাও আগের চেয়ে শতকরা ২০ ভাগ বেড়েছে। পর্যটন খাতে গত ৮ বছরে ৬ হাজার ৬৯ কোটি টাকা আয় হয়েছে। আর গত ৬ বছরে ৩১ লাখ ২২ হাজার ৭৫৬ জন পর্যটক বাংলাদেশে ভ্রমণ করেছেন। ২০১০ সালে ভ্রমণ করেছেন ৫ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৫ জন, ২০১১ সালে ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৬৭৭ জন, ২০১২ সালে ৫ লাখ ৮হাজার ১৯৩ জন, ২০১৩ সালে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৯৬ জন, ২০১৪ সালে ৪ লাখ ৮৯ হাজার ৫৩১ জন এবং ২০১৫ সালে ৬ লাখ ৪৩ হাজার ৯৪ জন।

২০১৬ সালে পর্যটন খাত থেকে আয় হয়েছে ৮০৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা, ২০১৫ সালে ১ হাজার ১৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা, ২০১৪ সালে ১ হাজার ২২৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২০১৩ সালে ৯৪৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, ২০১২ সালে ৮২৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা, ২০১১ সালে ৬২০ কোটি ১৬ লাখ টাকা, ২০১০ সালে ৫৫৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা এবং ২০০৯ সালে ৫৭৬ কোটি ২২ লাখ টাকা।

গত মে মাসে ৮০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ উদ্বোধন করা হয়। কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে টেকনাফের সাবরাং পর্যন্ত যানবাহন চলাচলের উপযোগী উপযোগী করা হয়েছে সড়কটি।

তিন ধাপে এ সড়কটির প্রথম পর্যায়ের কলাতলী থেকে ইনানী পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটারের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০০৮ সালে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ইনানী থেকে শিলখালী পর্যন্ত আরও ২৪ কিলোমিটারের কাজ সম্পন্ন হয় ২০১৬ সালের জুন মাসে। তৃতীয় পর্যায়ে শিলখালী থেকে টেকনাফের সাবরাং পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটারের কাজ শেষ হয় এ বছর এপ্রিল মাসে।

দেশের পর্যটন খাতকে এগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নে পর্যটন শিল্পকে অন্যতম অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে। ২০১০ সালে ট্যুরিজম বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তিনি জানান, সাবরাং টুরিস্ট জোন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রায় এক হাজার ১৬৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯৩৭ একর সরকারি খাসজমি। আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে সমুদ্রসৈকতের ১৩৫ একর জমি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে সরকার।

এছাড়া পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় কক্সবাজারের বিদ্যমান পর্যটন কমপ্লেক্স, পর্যটন রিসোর্ট ও এন্টারটেইনমেন্ট ভিলেজ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হচ্ছে। যা পর্যটন শিল্পকে নতুন মাত্রা দেবে।

এর আগে ২০০৯ সালের ৩০ জুন বিশ্বমানের বিশেষ পর্যটনপল্লি তৈরির জন্য অর্থ সহায়তার ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে আইডিবির চুক্তি হয়। এরপর বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন উখিয়ার মনখালী ও মহেশখালীর সোনাদিয়ায় পৃথক দুটি বিশ্বমানের পর্যটনপল্লি তৈরি প্রকল্প হাতে নেয়। কিন্তু ২০১০ সালে আইডিবি প্রকল্পের বিপরীতে অর্থায়নে অপারগতা প্রকাশ করে।

মন্তব্য করুন

comments