বিশ্বের সবচেয়ে বড় আর বিধ্বংসী বোমা ‘জার বোম্বা’

80
শেয়ার
ছবিঃ সংগৃহিত

১৯৬১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি বোমার বিস্ফোরণের মাধ্যমে পরীক্ষা চালায় যেটি সর্বকালের সর্ববৃহৎ আনবিক আর সবচেয়ে বিধ্বংসী বোমা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বোমাটির নাম দেওয়া হয়েছে জার বোম্বা (Tsar Bomba)। এছাড়া বোমাটিকে কুজকিনা ম্যাট (Kuzkina mat) নামেও ডাকা হয়।

জার বোমার ওজন ছিলো ২৭ মেট্রিকটন। এটি দৈর্ঘ্যে ২৬ ফুট এবং এর ব্যস ৬.৯ ফুট। বোমাটি একটি প্যারাস্যুটের সাথে যুক্ত ছিলো যার নিজেরই ওজন ১৮০০ পাউন্ড। এই প্যারাস্যুট ব্যবহার করে বোমাটির পতন আরো ধীর করা হয় যা বোমারু এবং পরিদর্শক বিমানদুটিকে নিরাপদে ফিরে আসার জন্য বাড়তি সময় দেয়। এতসব বাড়তি সতর্কতা স্বত্বেও বিমানদুটির নিরাপদে ফিরে আসার সম্ভাবনা ধরা হয় ৫০%।

নিক্ষেপের দিন মস্কোর সময় বেলা ১১ টা ৩২ মিনিটে উত্তর মেরুর কাছে মিতিউশিখা বে নিউক্লিয়ার টেস্টিং রেঞ্জে বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বায়ুমন্ডলীয় সেন্সরের মাধ্যমে ভূমির ১৩,০০০ ফুট উপরে থাকতেই বোমাটিকে বিস্ফোরণ ঘটানোর ব্যবস্থা রাখা হয় এবং বোমাটি নিক্ষেপ করা হয় ভূমির ৩৪,০০০ ফুট উপর হতে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন মেতে উঠেছিল ‍যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায়। তারই অংশ হিসেবে দুই দেশেই চলছিল পরমাণু অস্ত্র তৈরির কর্মসূচি। ১৯৪৯ সালের ২৯ আগস্ট জো-১ নামে প্রথম একটি পরমাণু বোমার পরীক্ষা চালায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৫৮ সালের মধ্যে দেশটি ৩৬টি পরমাণু বোমার পরীক্ষা চালায়। কিন্তু তু-৮৫ বা জার বোম্বার তুলনায় এ বোমাগুলো কিছুই নয়।

জার বোম্বা আকারে এতই বড় ছিল যে কোনো বিমানে তা আঁটানো কষ্টসাধ্য ছিল। ৮ মিটার লম্বা, ব্যাস ২.৬ মিটার এবং ওজন ছিল ২৭ টন। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ব্যবহার করা লিটল বয় ও ফ্যাট ম্যানের মতো ছিল এই বোমা। তখন বিভিন্ন নামে ডাকা হতো এই বোমাকে। যার মধ্যে প্রোজেক্ট ২৭০০০, প্রোডাক্ট কোড ২০২, আরডিএস ২২০ ও কুজিনা ম্যাট অন্যতম ছিল।

সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ চেয়েছিলেন সারাবিশ্বকে নিজেদের পরমাণু শক্তি দেখিয়ে কাঁপিয়ে দিতে। তারই একটা অংশ হিসেবে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী বোমা তৈরির চেষ্টা করেন সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা।

বার্নেট সাগরের জনবিরল নোভইয়া জেমলিয়া দ্বীপপুঞ্জে এই বোমার পরীক্ষা করা হয়। দুটি বিমান একে বহন করে নিয়ে যায়। প্যারাস্যুট দিয়ে যখন বোমাটি নামানো হয় তখন তা ১৩ হাজার ফুট নিচে নেমে বিস্ফোরিত হয়। ঘটনাস্থল থেকে বোমারু বিমান ছিল মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে। দুই পাইলট ভাগ্যের জোরে বেঁচে যান।

প্রায় ৬৪ কিলোমিটার উঁচু মেঘের সৃষ্টি হয় যার বিস্তার ছিল ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। বোমা বিস্ফোরনের পর এক ঘণ্টার জন্য রেডিও যোগাযোগ অকেজো হয়ে পড়ে। বোমাটি হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ব্যবহার করা বোমার থেকে দেড় হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী।

জার বোম্বার সমস্যা ছিল, এটা এতো বড় ছিল যে কোনো বিমানে বা ক্ষেপণাস্ত্রে তা আঁটতো না। যদি এই বোমার আকারে বিমান তৈরি হয় তবে তা লক্ষ্যস্থলে পৌছানোর জন্য নিজের প্রয়োজনীয় জ্বালানী বহন করতে পারবে না। যদি লক্ষ্যস্থলে পৌছাতেই হয় তবে সে বোমারু বিমান আর ফেরত আসতে পারবে না। পরমাণু বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেই সাখারোভ জানান, এ ধরণের বোমার আসলে কোনো ব্যবহারই নেই। যদি খুব বড় কোনো শহর ধ্বংস করতে চান তবুও এই বোমার ব্যবহার অতিরিক্তই হয়ে যাবে।

সাখারোভ জানান, এই বোমা যদি সত্যিই কোনো শহরে নিক্ষেপ করা হয় তবে এর প্রভাব থেকে আক্রমণকারী রাষ্ট্রও বাঁচবে না। কারণ এর যে তেজস্ক্রিয়তা তা সারাবিশ্বের ‍বায়ুমন্ডলে ছড়িয়ে যাবে। তাই ধ্বংসের জন্যও এই বোমাটি অনেক বড়।

মন্তব্য করুন

comments