চট্টগ্রামে ছিনতাই বেড়েছে; মিলছে না প্রতিকার

101
শেয়ার

বেশ কিছুদিন ধরে চট্টগ্রাম নগরীতে আশঙ্কাজনকভাবে ছিনতাই বেড়ে গেছে। আরও আশংকার বিষয় হলো, ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো ঘটছে দিনে দুপুরে।

চলতি বছরের মার্চে চট্টগ্রাম নগরের ওয়াসা মোড়ে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের সড়কে প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। বিকেল সাড়ে চারটায় ব্যস্ত এই সড়কে ছিনতাইকারীরা অস্ত্র ঠেকিয়ে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। তিনটি মোটরসাইকেলে সাতজন ছিনতাইকারী ছিল। মোটরসাইকেলের পেছনে কোনো নম্বরপ্লেট ছিল না।

এছাড়া সম্প্রতি এ মাসের ১৮ তারিখ চট্টগ্রামে বেড়াতে এসে ছিনতাইয়ের শিকার হন এক চীনা নাগরিক। ঐ দিন সকালে ডবলমুরিং থানার চৌমুহুনী এলাকায় ছিনতাইকারীরা চীনের নাগরিক লি লি লিওয়ের (৩০) কাছ থেকে ব্যাগ টান দিয়ে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

এর আগে জুন মাসের ২২ তারিখ বৃহস্পতিবার রাতে জাকির হোসেন রোডে ছিনতাই এর শিকার হন ডিনা হ্যানসন নামে এক মার্কিন নারী। পেশায় তিনি নগরীর এশিয়ান ইউমেন ইউনিভার্সিটি শিক্ষক। এসময় সিএনজি অটোরিকশা করে এসে দুই ছিনতাইকারী তার হাতে থাকা ব্যাগটি টান দিয়ে নিয়ে যায়। এসময় তার ব্যাগে ল্যাপটপ, আইপড, মোবাইল, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ব্যাংক কার্ড ও নগদ সাত হাজার টাকা ছিল।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পারদর্শীতায় ছিনতাইকারীদের একজনকে আটক করতে সমর্থ হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ছিনতাইকৃত মালামাল।

পুলিশ সূত্র জানায়, আটককৃত নাগর পন্ডিত পেশাদার ছিনতাইকারী এবং নগরীর বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও রয়েছে। সে দৈনিক সংবাদ মোহনা নামক একটি সংবাদ মাধ্যমের সাংবাদিক পরিচয়ে নম্বর বিহীন সিএনজি ব্যবহার করে এই অপকর্ম করত।

কয়েকটি স্পটে সক্রিয় ছিনতাইকারী চক্র

কয়েকটি পেশাদার ছিনতাইকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে নগরী বেশ কয়েকটি স্পটে। প্রায় প্রতিদিন ৮/১০টি গ্রুপ নগরীর অন্ততঃ ১১১ টি স্পটে ছিনতাই করে বেড়াচ্ছে।

বিভিন্ন মার্কেট ও শপিংমলের আশপাশের সড়ক, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, ছোটপুল, বড়পুল, হালিশহর তাসফিয়া থেকে ওয়াপদা মোড়, কাস্টমস সেতু, বন্দর ফটক, ইপিজেড, অলংকার, টাইগারপাস, সিআরবি, পুরাতন রেলস্টেশন, নতুন রেলস্টেশনের মুখ, নিউমার্কেট, কোতয়ালি, লালদীঘির পাড়, প্রবর্তক, কাতালগঞ্জ, শহীদ মিনারের সামনের সড়ক, বক্সিরহাট বিট, ষোলশহর, জিইসি মোড়সহ ও নগরীর বিভিন্ন বস্তির আসেপাশে এই স্পটগুলো চিহ্নিত করেছে সিএমপি।

এসব এলাকায় ব্যাগ টানা গ্রুপ, হামকা পার্টি, গামছা পার্টিসহ ৮/১০টি গ্রুপের নাম উঠে এসেছে। এছাড়া ছিনতাই কাজে বেড়েছে সিএনজি অটোরিকশার ব্যবহার। অটোরিকশা চালকরা ছিনতাইকারীদের সঙ্গে যোগসাজশে নগরীর বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই করে।

রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজি অটোরিকশা ব্যবহার করে ছিনতাই করে তারা। শুধু রাতে বদলি ড্রাইভার হিসেবে তারা গাড়ি চালায় এবং সুযোগ বুঝে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় রিকশা যাত্রীদের টার্গেট করে ব্যাগ টান দিয়ে নিয়ে যায়।

অভিনব কায়দায় ছিনতাই

প্রকাশ্য দিবালোকে কিংবা রাতের আঁধারে অভিনব কায়দায় বন্দর নগরী চট্টগ্রামে প্রায় প্রতিটি এলাকায় ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা।

গত বছর এপ্রিলে এক ব্যবসায়ী আন্দরকিল্লা এলাকা থেকে টাকা তুলে চান্দগাঁও যাচ্ছিলেন। পথে সিটি করপোরেশন এলাকায় কয়েকজন তরুণ তাদের একজনের বোনকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ তুলে ওই ব্যবসায়ীকে মারধর করে তার টাকার ব্যাগটি নিয়ে পালিয়ে যায়।

এ বছর মার্চে নগরীর চকবাজারে প্রকাশ্যে রিক্সা থামিয়ে দুই কিশোরের কাছ থেকে মোবাইল চাইতে থাকে অপরিচিত দুই যুবক। এরমধ্যে মানুষের ভিড় বাড়লে সটকে পড়ে অন্যজন। নিজেকে কলেজ শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দেয়া যুবকটি তখনও দাবি করে কিশোরের পূর্ব পরিচিত বলে। পরে তাকে ধরে থানায় নিয়ে গেলে বেরিয়ে আসে আসল পরিচয়। কলেজ শিক্ষার্থী নয়, তারা পেশাদার ছিনতাইকারী।

জুন মাসে নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন পুরাতন রেলস্টেশন এলাকায় পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাইয়ের সময় একজনকে আটক করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। ছিনতাইয়ের সময় একটি ছোরা ও ছিনতাইকৃত পঁচিশ হাজার টাকা সহ হাতে নাতে তাকে আটক করা হয়।

এছাড়া নগরীতে ছিনতাইকারীরা বিভিন্ন জায়গায় পালা করে ছিনতাই করে। একদল ভোরবেলা ছিনতাই করে। তাদের লক্ষ্যবস্তু হন ট্রেন ও দূরপাল্লায় করে আসা যাত্রীরা। তারা সবসময় সিএনজি অটোরিকশা ব্যবহার করে থাকে।

এভাবেই প্রকাশ্যে ও নানান অভিনব কায়দায় ছিনতাইয়ের এমন ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত।

ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে মৃতুবরণও করতে হচ্ছে

২০১৩ সালে আমবাগান এলাকায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে আবদুল কাইয়ুম নামের এক পুলিশ কনস্টেবল নিহত হয়েছিলেন। এ ঘটনার তিন দিন পর ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে কনস্টেবল হত্যা মামলার প্রধান আসামি সুমনকে অস্ত্রসহ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গত ১৩ জুন রাতে নগরীর জামালখানে আইডিয়াল স্কুলের সামনে শিরিন আক্তার (২৪) নামে এক তরুণী ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। ছিনতাইকারীরা চলন্ত রিকশায় ব্যাগ টান দেওয়ায় পড়ে গিয়ে তিনি মাথায় গুরুতর আঘাত পান। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ছয়দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় পুলিশ এরশাদ উল্লাহ (৩০) নামে এক পেশাদার ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে।

টার্গেট মোবাইল সেট

বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ছিনতাইকারীদের টার্গেট থাকে মোবাইল সেট। প্রতিদিন গড়ে শ খানেক মোবাইল সেট চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে নগরীর ষোলটি থানায়। মূলত রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ নগরীর বিভিন্ন মার্কেটে সার্ভিসিং দোকানে বিক্রি হয় এসব মোবাইল সেট।

বিভিন্ন কারিগরি প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবর্তন করা হয় ডিভাইসের আন্তর্জাতিক পরিচয় বা আইএমইআই নম্বর। ফলে বেশিরভাগ মুঠোফোন উদ্ধার করতে পারে না পুলিশ। এর আগে মে মাসে নগরীর সিঙ্গাপুর-ব্যাংকক মার্কেট এ বিশেষ অভিযান চালায় গোয়েন্দা পুলিশ।

কয়েকটি সেট উদ্ধার হলেও ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে মূল অপরাধীরা। ডিভাইসের আন্তর্জাতিক পরিচয় পরিবর্তন করার পরও কারিগরি প্রযুক্তির মাধ্যমে সেটি উদ্ধার করা যায় কিনা তার চেষ্টা চলছে জানায় গোয়েন্দা পুলিশ বিভাগ।

প্রতিকার হচ্ছে না

ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলোর একটা বড় অংশ থানায় লিপিবদ্ধ হয় না। এ নিয়ে ভুক্তভোগী ও পুলিশের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রয়েছে।

ছিনতাইয়ের শিকার একাধিক ব্যক্তি জানান, ছিনতাই কিংবা প্রতারণার শিকার হয়ে থানায় অভিযোগ দিতে গেলে পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হয়। পকেটমার বা ছিনতাইয়ের ঘটনায় পুলিশ মামলা নেয় হারানোর বা চুরির। ফলে এসব মামলায় কাউকে আসামি করা হয় না। যে কারণে ছিনতাইকারীরা সহজে পার পেয়ে যায়।

এমনকি বেশির ভাগ সময় ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তিরা থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ দেন না। ফলে এসব দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। অনেকক্ষেত্রে দেখা গেছে ছিনাতাইকারীকে আটকের পর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও স্বাক্ষ্য প্রমানের অভাবে তাকে বেশীদিন আটকে রাখা সম্ভব হয়না। অথবা আইনের ফাঁক গলে তারা দ্রুত বের হয়ে যায়, আবার একই অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পরে।

পুলিশ মনে করছে ছিনতাইকারীদের হালনাগাদ তথ্য না থাকা ও ভুক্তভোগীদের মামলায় অনীহার কারণে চট্টগ্রামে ছিনতাই প্রতিরোধে সাফল্য আসছে না। পুলিশের ভাষ্য, ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তিরা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করলেও মামলা করতে অনীহার কারণে তারা ছিনতাই প্রতিরোধে তেমন কিছু করতে পারেন না।

মোবাইল ফোন ও নগদ অর্থ হারানোর এসব ঘটনায় থানায় অভিযোগ করা হলেও পুলিশ পাত্তা দেয়না এমন অভিযোগের জবাবে পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) শাহ মোহাম্মদ আব্দুর রউফ বিষয়টি শিকার করেন। তিনি জানান ছিনতাইয়ের ঘটনায় ‘হারানোর’ জিডি না নিয়ে মামলা নিতে থানাগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া আছে।

বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা আদালতে যাওয়া এড়াতে চান বলে মামলা করেন না। জিডির মাধ্যমে অনেক সময় মোবাইল উদ্ধার হলেও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় অপরাধীদের পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারে না।

নগর পুলিশের এক উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, “ছিনতাইয়ে যারা জড়িত হচ্ছে তাদের অনেকে ভাসমান। এক জায়গা থেকে ছিনতাই করে অন্য জায়গায় আশ্রয় নেয়।” তবে ছিনতাইকারীদের ধরতে পুলিশের তৎপরতা আছে এবং ধরাও পড়ছে বলে তিনি দাবি করেন।

মন্তব্য করুন

comments