চুরি হওয়া শিশু উদ্ধার; জড়িত হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিকের কর্মচারীরাও!

20
ছবিঃ উদ্ধার হওয়া শিশু মোহাম্মদ আলী এবং তার মা শেফালী বেগম

চট্টগ্রামে বেশির ভাগ শিশু চুরিতে সক্রিয় রয়েছে হাসপাতালের আয়া, নার্স ও বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কর্মচারীরা। চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে শিশু সংগ্রহ করে শিশু চুরির এই চক্রটি তা বিক্রি করে নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে। চুরি হয়ে যাওয়ার পাঁচ মাস পর এক শিশুকে উদ্ধারের পর এ তথ্য জানায় পুলিশ।

গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে করা মামলার এজাহারসূত্রে জানা যায়, নগরীর রেয়াজউদ্দিন বাজারের আমতল এলাকা থেকে গত ২৮ মে চুরি হয় শেফালী বেগম নামের ভিক্ষুক এক নারীর দুই মাস বয়সী বাচ্চা মোহাম্মদ আলী। এ ঘটনায় ওই নারী কোতোয়ালী থানায় মামলা করেন। মামলার পর তিনজনকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি রবিবার (৩ নভেম্বর) ভোররাতে পুলিশ নগরীর দামপাড়া পল্টন রোডের এক দম্পতির কাছ থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে।

গ্রেপ্তারকৃত শিশু চক্রের সদস্যরা হলেন- সুজিত কুমার নাথ (৪৫), মো. আফসার ওরফে জাফর সাদেক (৩৮) ও পারভীন আক্তার (৩০)। যাদের মধ্যে আফসার ‘মূল হোতা’ বলে পুলিশের দাবি।

আসামিদের গ্রেপ্তারের পর বিকালে মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এসএম মেহেদী হাসান বলেন, মূলত গরীব মানুষের শিশু সন্তানদের টার্গেট করে চক্রটি। তাদের কাছ থেকে শিশু চুরি করে বিক্রি করে নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের মধ্যে আফসার দলটি পরিচালনা করতেন। বিভিন্ন হাসপাতালে এই চক্রটি সক্রিয় জানিয়ে তিনি বলেন, নিঃসন্তান দম্পতিদের সাথে চুক্তি করে বাচ্চা চুরি ও সংগ্রহ করতো তারা। শিশুগুলোকে নিজেদের মৃত স্বজনের সন্তান বলে বিক্রি করা হতো।

গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আফসার জানান, বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্রাইভেট ক্লিনিক ও ওষুধের দোকানে ক্রেতা পাঠিয়ে কমিশন নেয়ার কাজ করতেন তারা। তিনি নিঃসন্তান দম্পতির খোঁজ নেন বিভিন্ন হাসপাতালের আায়া, নার্সদের মাধ্যমে। আর বাচ্চা সংগ্রহ করেন ইকবাল ও ইমরানের মাধ্যমে। পরে শিশুগুলোকে বিক্রি করেন তাদের কাছে । প্রতিটি বাচ্চার জন্য তিনি ১০ হাজার টাকা করে পান বলেও জানান চক্রের ‘মূলহোতা’ আফসার ওরফে জাফর সাদেক।

জানা গেছে, শেফালী বেগম পেশায় একজন ভিক্ষুক। গত ২৬ মে নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকায় ভিক্ষা করতে গিয়ে তিনি হাত পাতেন ইকবাল নামের এক পথচারীর কাছে। সেসময় তার কোলে ছিলো দুই মাস বয়সী মোহাম্মদ আলী। গায়ে কাপড় না থাকাতে ইকবাল তাকে কিনে দেয় নতুন কাপড়। এভাবেই পরিচয়ের শুরু শেফালী ও ইকবালের। পরদিন বিকালে রাস্তায় ভিক্ষার সময় হঠাৎ অসুস্থতা অনুভব করেন শেফালী। কয়েকবার বমিও করেন। ঠিক সেই সময়েই ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিল ইকবাল। শেফালীকে দেখে ইকবালও থামে। তাকে পানি দেয়। বাচ্চা কোলে নেয় এবং শেফালী কে মুখ ধুয়ে আসতে বলে। ইকবালের কাছে বাচ্চা রেখে মুখ ধুতে যায় শেফালী। কিন্তু মুখ ধুয়ে এসে দেখে ইকবাল কিংবা বাচ্চা কেউই নেই। সারাদিন হন্যে হয়ে খুঁজে না পেয়ে পরে না পেয়ে কোতোয়ালী থানায় মামলা করেন।

কোতোয়ালী থানার ওসি মোহাম্মদ মহসিন জানান, মার্কেটের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে শেফালীর বাচ্চা চুরি করা যুবককে শনাক্ত করা হয়। তদন্তে নেমে পুলিশ গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে ইপিজেড থানা এলাকায় শিশু চুরির অভিযোগে ইকবালকে গ্রেপ্তার করে। কোতোয়ালী থানার মামলায় ইকবালকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে শেফালীর বাচ্চা চুরির বিষয়টি স্বীকার করে ও আদালতে জবানবন্দি দেয়।

ওসি জানান, ইকবালের কাছ থেকে শিশু চোরের ‘মূল হোতা’ আফসারের তথ্য পাওয়া যায়। পরে শনিবার বিকালে কক্সবাজারের কলাতলী থেকে আফসারকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে চট্টগ্রামে এনে রাতে অক্সিজেন এলাকা থেকে পারভীন আক্তার ও গভীর রাতে নগীর মেহেদী বাগের ন্যাশনাল হাসপাতালের সামনে থেকে সুজিত নাথকে গ্রেপ্তার করা হয়।

কোতোয়ালী থানায় আফসার জানান, তিনি কমিশনের বিনিময়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপতাল গেইটের বিপরীতে ‘বেসিক ল্যাব’ নামের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী নিয়ে যান। সেখানে ইকবাল ও ইমরান নামে দুইজনের সাথে তার পরিচয় হয়। তারাও বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্রাইভেট ক্লিনিক ও ওষুধের দোকানে ক্রেতা পাঠিয়ে কমিশন নেওয়ার কাজ করতেন। বিভিন্ন হাসপাতালের আায়া, নার্সদের মাধ্যমে তিনি নিঃসন্তান দম্পতির খোঁজ নেন। আর ইকবাল ও ইমরানের মাধ্যমে বাচ্চা সংগ্রহ করেন। পরে শিশুগুলোকে তাদের কাছে বিক্রি করেন।

আফসারের দাবি, প্রতিটি বাচ্চার জন্য তিনি ১০ হাজার টাকা করে পান।

উদ্ধার হওয়া শিশুটির প্রসঙ্গে আফসার বলেন, ন্যাশনাল হাসপাতালের ল্যাব টেকনেশিয়ান সুজিত নাথ তার এক আত্মীয় জন্য একটি বাচ্চা সংগ্রহ করতে বলেছিলেন। সে জন্য ইকবালকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বাচ্চা সংগ্রহ করার জন্য।

কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. কামরুজ্জামান বলেন, বিভিন্ন হাসপাতালের গাইনি ও ক্যান্সার ওয়ার্ডের আয়া, নার্সদের নিয়ে চক্রটি গড়ে তুলেছেন ইকবাল। আয়া নার্সদের মাধ্যমে তারা নিঃসন্তান দম্পতির খোঁজ নিয়ে তাদেরকে বাচ্চা সংগ্রহ করে দেওয়ার চুক্তি করে। সেজন্য তারা ভিক্ষুক, দরিদ্র মহিলাদের বাচ্চা চুরির পাশাপাশি বিভিন্ন প্রসূতি সেবা হাসপাতালগুলোর আয়া নার্সদের সাথে যোগাযোগ করে সেখান থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করে। সংগ্রহ করা বাচ্চা বুঝিয়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত পারভীনের কাছে লালন পালন করতে দিত।

কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. কামরুজ্জামান শিশু উদ্ধারের ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, উদ্ধার করা শিশুকে আদালতের মাধ্যমে তার প্রকৃত মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি কারাগারে পাঠানো হয়েছে গ্রেপ্তারকৃত তিন আসামিকে।

মন্তব্য করুন

comments