চট্টগ্রামে যৌতুকের বলী হলো নববধূ মিতু

50
বিয়ের অনুষ্ঠানে মিতু

চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ এলাকায় শারমিন আফরোজ মিতু (২৬) নামে এক গৃহবধূকে যৌতুক না পেয়ে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার ঘটনা ঘটেছে। বিয়ের পর আড়াই মাস পার না হতেই এ হত্যাকান্ডের শিকার হন তিনি। একটি গার্মেন্টসে কর্মরত ওই গৃহবধূকে হত্যার পরে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে চালাতে লাশটি এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নেওয়া হয়।

গত সোমবার (৭ই অক্টোবর) সন্ধ্যায় পাঁচলাইশ থানাধীন নাজিরপাড়া এলাকায় ঝগড়ার এক পর্যায়ে মিতুকে হত্যা করা হয়। নিহত মিতু রাউজান উপজেলার উকিলপাড়ার বাসিন্দা মৃত আকতার হোসেনের মেয়ে।

ওই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় পুলিশ সোলেমান হোসেন লিটন নামে নিহতের স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেফতার লিটন নোয়াখালী জেলার মাইজদী উপজেলার উত্তর সুর লেইদ্দা গ্রামের কামাল উদ্দিনের ছেলে।

নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, কেইপিজেড এলাকায় একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন মিতু। গত ২৫ জুলাই লিটনের সঙ্গে মিতুর বিয়ে হয়। তার স্বামী লিটন পেশায় রাজমিস্ত্রি। বিয়ের পর থেকে স্বামীর সঙ্গে পাঁচলাইশের নাজিরপাড়া মানিক ভিলায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। তবে মিতু চান্দগাঁও থানাধীন হাদু মাঝিপাড়ায় বাদশা মেম্বার বাড়ির নানার বাসায় থেকে বড় হয়েছেন। ওখান থেকেই এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি।

পাঁচলাইশ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. শাহাদাত হোসাইন জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে লিটন স্বীকার করেছে, পারিবারিক বিরোধ থেকে মারধর করার এক পর্যায়ে ওড়না দিয়ে গলা পেঁচিয়ে স্ত্রীকে খুন করে সে। পরে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে লোকজনকে জানানোর চেষ্টা করে। ওই গৃহবধূর গলায় দাগ থাকার পাশাপাশি মুখের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তার স্বামী ও শাশুড়ি মিলে এই কাজটি করেছে বলে আমাদের ধারণা।

পরিদর্শক শাহাদাত বলেন, ওই গৃহবধূকে মেরে ফেলার পর তার স্বামী প্রথমে তাকে ডেল্টা হাসপাতালে আনে। সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তার মিতুকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য রেফার করলে লিটন সেখানে নিতে গড়িমসি শুরু করে। পরে না পারতে সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। কাউকে কিছু না জানিয়ে সে একাই স্ত্রীকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল নিয়ে গিয়েছিল।

খবর পেয়ে পাঁচলাইশ থানা পুলিশের এসআই মাসুদের নেতৃত্বে একটি টিম চমেক হাসপাতালে আসে। লিটন নিজেকে বাঁচাতে গলায় দড়ি দিয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে আত্মহত্যা হিসেবে চালানোর চেষ্টা করছিল। লাশটির ধরন দেখে হত্যাকাণ্ড হিসেবে সন্দেহ হওয়ায় পুলিশ তার স্বামীকে বসিয়ে রাখে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। পরে তাকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই শীলব্রত বড়ুয়া বলেন, সোমবার রাতে সোলেমান হোসেন লিটন স্বামী পরিচয়ে ওই গৃহবধূকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনে। সে এটি আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করে। হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক ওই গৃহবধূর মারা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তাৎক্ষণিক লিটনকে জানায়নি। ওই সময় পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হয়। এসময় লিটন লাশটি রেখে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

মিতুর পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বিয়ের পর থেকেই স্বামী ও শ্বাশুড়ি মিলে তাকে যৌতুকের জন্য নির্যাতন করে আসছে। বাপের বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে আসার জন্য সবসময় চাপ দিত। এছাড়া প্রতি মাসে মিতুর বেতনের টাকা কেড়ে নিত। তা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হতো। তিনদিন আগে যৌতুক ও বেতনের টাকা নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল। মিতু ফোন করে বিষয়টি জানিয়েছিল। এ সময় তাকে মারধরের কথা জানায়।

পরদিন দুপুরে হাসপাতাল মর্গ থেকে মিতুর লাশ হাদু মাঝিপাড়ায় নানাবাড়িতে নেয়া হলে সেখানে স্বজনদের আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মিতুর মা পারভীন আক্তার বলেন, বিয়ের পর থেকে আমার মেয়ের কপালে সুখ নেই। মেয়ের সুখের জন্য বিয়ের সময় তার স্বামীকে অনেক কিছু দিয়েছি। এরপরও তারা আমার মেয়েকে নির্যাতন করত।

প্রতিবেশীরা জানান, ছোটবেলা থেকে মেয়েটি এখানে বড় হয়েছে। ও ভালো মেয়ে। তাকে কেন এভাবে মেরে ফেলল?

এই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার আসামি হিসেবে নিহতের স্বামী লিটনকে গ্রেপ্তার করে দশদিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

মন্তব্য করুন

comments