এস এম ফারুক; এক বীর মুক্তিযোদ্ধার বর্ণাঢ্য সংগ্রামী জীবন

49

কোন কোন মানুষের অভাব মানুষ সহজেই কাটিয়ে ওঠে, আবার কারো কারো অভাব সহজেই পূরণ হবার নয়। সে’সব মানুষের দৈহিক মৃত্যু হলেও তাদের নীতি ও আদর্শের মৃত্যু হয়না কখনো। কর্মই মানুষের মাঝে তাদের চিরদিন বাঁচিয়ে রাখে। তেমনই একজন মানুষ ছিলেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কৃতিসন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগ নেতা, মাটি ও মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত এস এম ফারুক।

এস এম ফারুক ছিলেন এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী। এ-নেতা দেশ ও দেশের মানুষকে দিয়েছেন অনেক, কিন্তু নেননি কিছুই।

বাংলাদেশ কৃষকলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সহ-সভাপতি এবং বিশিষ্ট সাহিত্যিক বীর মুক্তিযুদ্ধা মরহুম আলহাজ্ব এস,এম ফারুক এর সংগ্রামী জীবনের যাত্রা শুরু হয় জাগ্রীতির ছদ্ধাবরণে ১৯৫৯ সালে চট্টগ্রাম নাইট কলেজে ছাত্রলীগে যোগদানের মধ্যে দিয়ে।

১৯৬২ সালের হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে এবং ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬দফা আন্দোলনের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক ও প্রচারক ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৬৭ সালে আইয়ুব খানের শাসন আমলে ঢাকায় গ্রেফতার হয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। তিনি

১৯৭০ এর নির্বাচনে তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় কর্মী।

১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে তিনি মহান মুক্তিযোদ্ধায় অংশগ্রহন করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তি সংগ্রামের তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় সংগঠক এবং ১নং সেক্টরের অধীনে বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেন।

সিংহ হৃদয়ের এস এম ফারুককে চিনতে ভুল করেননি বঙ্গবন্ধু। তিনি তাকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন পরম মমতায়। সমগ্র বাংলাদেশ থেকে ৫১ জন সদস্যের যে কৃষকলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু, সেখানে এস,এম ফারুককে রাজনীতির প্রতি নিবেদিত কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য নির্বাচিত করেন।

১৯৭২ সালে তিনি ফটিকছড়ি থানা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম জেলার প্রধান নির্বাচিত হন।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে কৃষকলীগে জড়িত হয়ে কৃষকদের সংগঠিত করেন।

১৯৭৩ সালে জেলা আওয়ামীলীগের কৃষি সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু বেতনবুনিয়া উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধন কালে সর্বপ্রথম হাটহাজারী থানায় কৃষক সমাবেশের আয়োজন করেন এবং বঙ্গবন্ধুকে কাস্তে ও লাঙল দিয়ে কৃষকলীগের পক্ষ থেকে অভ্যর্থনা জানান।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট-এ জাতির জনকের নির্মম হত্যাকান্ডের পর তিনি বঙ্গবন্ধুর সৈনিকদের সংগঠিত করার কাজে নেমে পড়েন।

১৯৭৬ সালের ২৫শে আগষ্ট তৎকালীন শাসকের নির্দেশে সেনাবাহিনী কর্তৃক গ্রেপ্তার হয়ে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে দীর্ঘ ১১ দিন ইলেকট্রিক থার্ড ডিগ্রি নির্যাতনের শিকার হন। এবং বিনা বিচারে দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর চট্টগ্রাম কারাগারে আটক থাকেন।

১৯৭৯ সালে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশে মুক্তি লাভ করেন। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি জেলা কৃষকলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৯০ সালের স্বৈরাচারীর বিরূদ্ধে এবং ১৯৯৬ এর অসহযোগ আনদোলনের তিনি একজন জেলা পর্যায়ের সংগঠক ছিলেন।

১৯৯৪ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম বিভাগীয় কৃষক মহাসমাবেশের আয়োজন করেন, যেখানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি ছিলেন।

এছাড়াও তিনি নিজ গ্রাম রোসাংগিরি’র দুই বারের সফল চেয়ারম্যান এবং আধুনিক রোসাংগিরির রূপকার ছিলেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০০০ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৬২ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের সিনিয়র মন্ত্রীবর্গের উপস্থিতিতে সমগ্র বাংলাদেশে সর্বপ্রথম বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে দাফন করা হয়। আজ ১০ই সেপ্টেম্বর এস. এম ফারুক এর ১৯তম মৃত্যু বার্ষিকী।

তিনি তাঁর সুদীর্ঘ সংগ্রামী জীবনে বেশকিছু বই রচনা করেন।

তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল- ১) বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারা, বাকশালের ভূমিকা ২) আমাদের মুক্তি সংগ্রামে বর্হিবিশ্বের ভূমিকা ৩) জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৪) উৎপাদনমূখী রাজনীতির নেপথ্য ৫) অন্তর্দলীয় দ্বন্দ সংঘাত ও তার সমাধান ৬) বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের অন্তরালে ৭) আধুনিক পোল্ট্রি পালন।

এস এম ফারুক ছিলেন, মৃত্তিকার সন্তান, মাটি, মানুষের বরপুত্র ও বরেণ্য রাজনীতিক। কাজেই শারীরিক মৃত্যু হলেও তাঁর আত্মা ও আদর্শের মৃত্যু হয়নি। তাঁর আদর্শ অম্লান অমলিন। তিনি তার কর্মের জন্য চিরদিন বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে, অন্তরের মণিকোঠায়।

মন্তব্য করুন

comments