সরকারি চাল পাচার: নেপথ্যে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা

62
শেয়ার
ছবিঃ সংগৃহিত

খোদ সরকারি কর্মকর্তারাই সরকারি চাল পাচারের সাথে জড়িত। গত সপ্তাহে চালানটি জব্দ করার পর থেকেই র‍্যাব চট্টগ্রামে সরকারি চাল পাচারকারি ও নেপথ্যে জড়িতদের খুঁজছল। র‍্যাবের তদন্ত করে কিছু অসাধু কর্মকর্তার সরকারি চাল পাচারের নেপথ্যে জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে।

হালিশহর ও আকবরশাহ এলাকা থেকে চাল জব্দের পর প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে র‍্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকারি চাল গুদামেই থাকে। মাঝখানে প্রকল্পের বরাদ্দ, পরিবহন, ভি-ইনভয়েস, ডিও ইত্যাদি ধাপ পেরিয়ে চালগুলো চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে চলে যায়। গুদাম থেকে চাল বের করার সময় ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করেন কর্মকর্তারা।’

জানা গেছে, ফখরুল আলম নামের এক কর্মকর্তা নিজেই কখনো ব্যবসায়ীর, কখনো আত্মীয়স্বজনের নামে লাইসেন্স নিয়ে ঠিকাদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তার মতোই এরকম কিছু অসাধু কর্মকর্তার ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকায় অবর্তীণ হয়ে সরকারি চাল কারসাজির মাধ্যমে কিনে বেশি দামে বিক্রি করেন কালোবাজারে। এছাড়, খাদ্য গুদামে ব্যবসায়ীদের কেনা চাল রেখে নিজে গুদামের মালিক সেজে ভাড়াও আদায় করেন।

ফখরুল আলম হালিশহর খাদ্য গুদামের সহকারী ব্যবস্থাপক। চাল জব্দ মামলার আসামি করার পর থেকে তিনি পলাতক। তার মত অনেক অসাধু কর্মকর্তাই এরকম ঠিকাদারী এবং ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

র‌্যাবের সূত্রে জানা গেছে, ফখরুলের স্ত্রী সালেহা আলমের নামে সুহৃদ ইন্টারন্যাশনাল, ছেলে সাজিদের নামে মেসার্স সাজিদ এন্টারপ্রাইজ, বাবা আবুল কালামের নামে মেসার্স কালাম অ্যান্ড সন্স ও আত্মীয় আবু নাছেরের নামে ছিদ্দিক এন্টারপ্রাইজসহ একাধিক সদস্যের নামে ঠিকাদারি লাইসেন্স নিয়েছেন। দুটি ট্রাকও আছে তার। সেগুলো খাদ্যশস্য পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। এর আগেও অনিয়মের অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। চাকরি থেকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল তাঁকে।

ছবিঃ সংগৃহিত

গত ১৭ জুলাই বিকালে নগরীর হালিশহর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৫৫ মেট্রিক টন সরকারি চাল উদ্ধার করে র‌্যাব-৭। পরদিন আকবর শাহ এলাকায় অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয় ১৩ মেট্রিক টন। পরে অভিযান চালিয়ে হালিশহর সিএসডি খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক প্রণয় চাকমাসহ পাঁচ জনকে আটক করা হয়। পরবর্তিতে ঐ ঘটনায় দুটি পৃথক মামলা দায়ের করে র‌্যাব। মামলায় প্রণয় চাকমা ও ফখরুল আলমকে অন্যতম আসামি করা হয়।

গ্রেপ্তারের পর প্রণয় স্বীকার করেছেন গুদামের চাল পাচার করা হচ্ছিল। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে তা অবৈধভাবে বিক্রি করা হয়েছিল। তাঁদের সঙ্গে এ কাজে হাত মিলিয়েছে খাদ্য বিভাগের ঠিকাদার এবং চট্টগ্রামের অসাধু পাহাড়তলী বাজার ও খাতুনগঞ্জের চাল ব্যবসায়ীরা। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী র‍্যাব জানতে পেরেছে প্রণয় চাল পাচারের সঙ্গে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী বাজারের ব্যবসায়ী সাহাব উদ্দিন এবং খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী নুরু সওদাগর জড়িত। এই দুই ব্যবসায়ীকেও মামলায় আসামি করা হয়েছে।

মামলার অগ্রগতির ব্যপারে জানতে চাইলে হালিশহর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহফুজুর রহমান জানান, তারা আদালতে রিমান্ডের আবদেন করেছেন। আজ রবিবার রিমান্ড আবেদনের শুনানি হবে। রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আরো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

মূলতঃ খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও অসাধু ব্যবসায়ী—এই চক্র নিয়ন্ত্রণ করে সরকারি চাল-গমের অবৈধ বাণিজ্য। গুদামের চাল গুদামে রেখেই ভি-ইনভয়েস (পরিবহন চালানপত্র) এবং ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) ইস্যু করে মুখে মুখে সব কাজ চলে। পরে সুযোগ বুঝে গুদাম থেকে চাল পাঠিয়ে দেওয়া হয় ব্যবসায়ীদের কাছে।

টিআর, জিআর, কাবিখা, ওএমএস এবং পাবর্ত্য চট্টগ্রামের বিশেষ খাদ্য কর্মসূচিসহ বিভিন্ন প্রকল্পের অনুকূলে স্থানীয় প্রশাসন সরকারি খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেয়। চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সরকারি বরাদ্দের খাদ্যশস্য পরিবহন করে ৩৪৬টি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান।

মন্তব্য করুন

comments