X

হালিশহরে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে ‘হেপাটাইটিস-ই’ আতংক

চট্টগ্রামের হালিশহরে উদ্বেগজনকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে জন্ডিসসহ পানিবাহিত রোগ।যাতে আক্রান্ত হয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে মারা গেছে অন্তত তিনজন। গত ৩০ দিনে মৃত্যুবরণ করেছে অন্তত ১০ জন।আক্রান্ত অবস্থায় আছে শিশু সহ হাজারও মানুষ। জন্ডিসসহ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত রয়েছে প্রায় প্রতিটি ঘরে। ফলে চরম আতংকে লক্ষাধিক বাসিন্দা। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওয়াসার সরবরাহ করা দূষিত পানি ব্যবহার করেই আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।এখানকার এক বেসরকারি ক্লিনিকেই গত একমাসে চিকিৎসা নিয়েছেন এরকম প্রায় দেড় হাজার মানুষ। মাসখানেক আগে, এই এলাকার কয়েকশো মানুষ আক্রান্ত হন জন্ডিস পানিবাহিত রোগে। মাঝখানে কমে এলেও নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় উদ্বিগ্ন প্রশাসন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওয়াসার সরবরাহ করা পানিতেই যত সমস্যা।

ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ গতকাল মঙ্গলবার নগরীর হালিশহর এলাকার আই এবং এইচ ব্লকের বিভিন্ন আবাসিক ভবন পরিদর্শন করেন। এ সময়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিভিন্ন বাসা–বাড়ির পানির নমুনা সংগ্রহ করেন ওয়াসার পরিদর্শকেরা।

এদিকে জন্ডিসে তিনজনের মৃত্যুর খবরে ওয়াসার দিকেই অভিযোগের তীর স্থানীয়দের।তারা বলছেন, গত এপ্রিল মাস থেকে ওয়াসার পানির জীবাণু থেকে জন্ডিসে আক্রান্ত হচ্ছেন এলাকার লোকজন। তারপরও ওয়াসা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। তবে বরাবরের মতো এটি ওয়াসার পানির কারণে নয় বলে দাবি করেছেন ওয়াসার এমডি (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ। মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর সোমবার টিম পাঠিয়ে হালিশহর এলাকার ২৪টি পয়েন্ট থেকে ওয়াসার পানি ও ট্যাংকের পানির স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, স্যাম্পলগুলো আমাদের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা–নিরীক্ষা হচ্ছে। রিপোর্ট পেতে ২৪ ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন। বুধবার রিপোর্ট পাওয়া যাবে। ওয়াসার পানির পাশাপাশি ট্যাংকের পানির রিপোর্টও পাব। নিজেদের ল্যাবরেটরির বাইরে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) চট্টগ্রামের ল্যাবরেটরি কর্তৃপক্ষকেও ওই এলাকার পানি পরীক্ষার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা চাই, আমাদের পাশাপাশি তারাও এই পানি পরীক্ষা করুক। এরপরও এর প্রকৃত কারণটা বের করা দরকার।

এ কে এম ফজলুল্লাহ জানান, হালিশহর এলাকায় জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে এক তরুণের মৃত্যুবরণের অভিযোগ পাওয়া পরিবারে খোঁজ নিলে তারা ওয়াসার পানি ফুটিয়ে পান করার কথা বলেন এবং ওয়াসার পানির কারণে তাদের ছেলের মৃত্যু হওয়ার কোনো অভিযোগও তারা কাউকে করেননি। জন্ডিসে আক্রান্ত অপর পরিবারে যোগাযোগ করা হলে তারা ওয়াসার পানি পান করে না, টিউবওয়েলের পানি পান করেন বলে জানিয়েছেন।

ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরো জানান, ওয়াসার পরিদর্শক দল গতকাল এবং তার আগের দিন হালিশহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করেছেন। তিনি সায়েন্স ল্যাবরেটরি কর্তৃপক্ষকে ভালোভাবে নমুনা পরীক্ষা করে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন। আজ বুধবার সংগৃহীত নমুনার ফলাফল পাওয়া যাবে বলে জানা গেছে।

এদিকে, নগরীর বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে হালিশহরের জন্ডিসে আক্রান্তদের তথ্য সংগ্রহে কাজ শুরু করেছে সিভিল সার্জন কার্যালয়।

সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত এপ্রিল থেকে ঈদের আগ পর্যন্ত ওই এলাকার ১৭৮ জনের জন্ডিসে (হেপাটাইটিস ‘ই’) আক্রান্ত হওয়ার তথ্য রয়েছে। এর বাইরে বর্তমানে ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজে (বিআইটিআইডি) ৩ জন, আগ্রাবাদের মা ও শিশু হাসপাতালে এক শিশুসহ ৯ জন রোগীর ভর্তি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া হালিশহরের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রক্ত পরীক্ষা করা ১৭ জনের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর পেয়েছে সিভিল সার্জন কার্যালয়। এপ্রিল থেকে বিভিন্ন সময়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারটিতে এই রক্ত পরীক্ষা করা হয়।

সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, আজ বুধবার ঢাকাস্থ রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইআইডিসিআর) দুই সদস্যের একটি টিম চট্টগ্রামে আসছে। তারা নমূনা সংগ্রহ করে ঢাকায় নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করবেন। তিনি বলেন, জন্ডিস হচ্ছে পানিবাহিত রোগ। পানির মান যতক্ষণ ভাল না হবে, ততক্ষণ এই ধরনের সমস্যা থাকবে।

জন্ডিস ও ডায়রিয়া উভয়ই পানিবাহিত রোগ হওয়ায় পানি–ই এসব রোগের কারণ বলে জানান সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। তিনি বলেন, এ রোগ থেকে রেহাই পেতে হলে ওই এলাকায় বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করতেই হবে। এছাড়া বিকল্প নেই। পানি ঠিক না হলে মানুষ নতুন করে এ রোগে আক্রান্ত হতে থাকবে। হয়ত কিছু সংখ্যক সেরে উঠবে। কিন্তু নতুন করে আক্রান্তের শঙ্কা থেকেই যাবে। তাই সবার আগে পানি ঠিক করতে হবে। অর্থাৎ বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করতে হবে। সেটা যেভাবেই হোক। প্রয়োজনে সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।

জন্ডিস আক্রান্ত হলেও এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলছেন সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। তিনি বলেন, জন্ডিস পানিবাহিত রোগ। আবার ঘরে কিংবা হোটেলে বাসি খাবার খেলেও জন্ডিস হয়ে থাকে। জন্ডিসের মধ্যে ৫টি ক্যাটাগরি রয়েছে। হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই। এর মধ্যে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ আক্রান্ত হলে সেটি গুরুতর বলা হয়। হেপাটাইটিস ‘ডি’ কে মধ্যম পর্যায় ধরা হয়। আর হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’–কে প্রাথমিক পর্যায় ধরা হয়ে থাকে। হালিশহরের যাদের রক্ত পরীক্ষা করা হয়েছে সবার শরীরে হেপাটাইটিস ‘ই’ ধরা পড়েছে। অর্থাৎ জন্ডিসের প্রাথমিক পর্যায়। ততটা গুরুতর নয়। তাই এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। অবশ্য, জন্ডিসে আক্রান্ত গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, গর্ভবতী নারী জন্ডিসে আক্রান্ত হলে কিছুটা ভয় থাকে। তাই কোনো গর্ভবতী নারীর জন্ডিসে আক্রান্তের আলামত পাওয়া মাত্র হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। এটাতে কোনো ধরনের অবহেলা করা যাবে না। পাশাপাশি জন্ডিস আক্রান্তের ২/৩ সপ্তাহেও না সারলে ওই রোগীকে দ্রুত সময়ের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দিয়েছেন সিভিল সার্জন।

ওই এলাকার মানুষদের বিশুদ্ধ পানি পান করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সবাইকে আমরা ওয়াসার পানি কমপক্ষে ৩০ মিনিট ফুটিয়ে পান করার পরামর্শ দিয়েছি। আর বাসার পানির ট্যাংক বিহ্মচিং পাউডার দিয়ে পরিষ্কারের কথা বলেছি। অন্তত চার মাস পরপর বাসার পানির ট্যাংক পরিষ্কার করতে হবে।

এদিকে, জন্ডিসে ৩ জনের মৃত্যুর বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) স্বাস্থ্য বিভাগ।হালিশহরের কিছু এলাকায় পানিবাহিত রোগের (হেপাটাইটিস–ই ভাইরাস) প্রাদুর্ভাবের কারণ অনুসন্ধানে সিটি কর্পোরেশন ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিতে চসিকের ডা. বিদ্যুৎ দাশগুপ্তকে প্রধান এবং দ্ইু স্বাস্থ্যকর্মীকে সদস্য করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ শেষে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। চট্টগ্রাম সিভিল সার্জনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদফতরে প্রতিবেদনটি পাঠানোর কথা জানিয়েছেন চসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেলিম আকতার চৌধুরী। তদন্ত কমিটির সদস্যরা ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছেন এবং আজ বুধবারের (২৭ জুন) মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবেন বলে জানা গেছে।

চসিকের স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার পর শাহেদা বেগম মিলি ন্যাশনাল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। মারা যাওয়া ওই নারীর অন্য কোনো জটিলতা ছিল না বলে প্রাথমিক তথ্য পেয়েছেন চসিকের স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসকরা। তবে ইয়াসির আরাফাত নামে মারা যাওয়া অপর এক রোগীর জন্ডিস ছাড়াও অন্যান্য জটিলতা থাকার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। প্রথম দিকে নগরীর বেসরকারি পিপলস হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিলেও জটিলতার দরুণ ইয়াসির আরাফাতকে পরে ঢাকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই মৃত্যু হয় তাঁর। এমন তথ্য জানিয়ে চসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেলিম আকতার চৌধুরী বলেন, শাহেদা বেগমের জন্ডিস ছাড়া প্রাথমিকভাবে অন্য কোনো জটিলতার বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু ইয়াসির আরাফাতের অন্য জটিলতাও ছিল। অন্য জটিলতার কারণেই তাকে ঢাকায় রেফার করা হয়। তবে মারা যাওয়া অন্য এক রোগীর (আশিকুল হাসান রিসাত) বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে আতংকিত না হয়ে সতর্ক হওয়ার আহবান জানিয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ডা. সেলিম আকতার চৌধুরী বলেন, তিন জনের মৃত্যুর খবর আমরা শুনেছি। এর মধ্যে দুইজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তবে আর কোনো সিরিয়াস রোগী নেই। তিনি বলেন, গত মে মাসে যখন হালিশহর এলাকায় জন্ডিসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় তখন থেকেই মেয়র মহোদয়ের নির্দেশে এলাকায় লিফলেট বিতরণসহ জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। জন্ডিস যেহেতু পানিবাহিত রোগ, তাই সচেতনতাই এর থেকে পরিত্রাণের মুখ্য উপায়।

রাস্তার পাশে বিক্রি করা শরবত খাওয়া থেকে বিরত থাকা এবং বাসি খাবার না খাওয়ার কথাও বলেন তিনি। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই উল্লেখ করে সচেতন হলেই পানিবাহিত এ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে বলে মন্তব্য করেন চসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেলিম আকতার চৌধুরী।

উল্লেখ্য,জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে হালিশহরের শাহেদা বেগম মিলি (৪০), ইয়াসির আরাফাত (২৮) ও আশিকুল হাসান রিসাত (১৮) নামের তিনজনের মৃত্যুর খবরটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকাটির পানিতে জন্ডিসের জীবাণু থাকার বিষয়টি আলোচনায় আসে। একই সাথে এই মৃত্যুর খবরে আতঙ্কও ছড়িয়ে পড়ে ওই এলাকার বাসিন্দাদের মাঝে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এমন তথ্য পেয়ে সোমবার হালিশহর যান সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী।পরে সবুজবাগ আবাসিক এলাকার কালিবাড়িতে ১১ জন এবং বড় মসজিদ এলাকায় ১৪ জন জন্ডিস রোগী শনাক্ত করা হয়। তাছাড়া গত এপ্রিল–মে মাসে ফৌজদারহাটে অবস্থিত বিআইটিআইডি হাসপাতালে হালিশহর এলাকা থেকে ৩০২ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নেন। দুটোই পানিবাহিত রোগ হওয়ায় তা ওইসব এলাকার পানি থেকে ছড়ানোর আশঙ্কা করা হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় অনেকে ওয়াসার পানি থেকে পানিবাহিত এ রোগ ছড়ানোর অভিযোগ আনেন।

উল্লেখ্য, নগরীর হালিশহর এলাকায় অন্তত ৫ লাখ লোকের বসবাস রয়েছে। আর পুরো বর্ষা মৌসুমে এখানে বৃষ্টির পানি জমে গিয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। আর সারা বছরই জোয়ারের পানিতে এখানকার বেশ কিছু এলাকা ডুবে থাকে।

মন্তব্য করুন

comments