X

চট্টগ্রামে ভয়ংকর রুপ নিচ্ছে কিশোর গ্যাং কালচার

চুরি-ছিনতাই বা ঘর পালানোর মতো অপরাধ পেছনে ফেলে কিশোরদের মধ্যে এখন বাড়ছে খুন-ধর্ষণের মতো ভয়ংকর অপরাধে জড়ানোর।যাদের প্রত্যেকের বয়স ১৪ থেকে ১৮ এর মধ্যে। কেউ পড়াশোনা করেছেন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত, কেউ ঝরে পড়েছেন তার আগেই।এছাড়া, কিশোর গ্যাং কালচারের প্রবণতাতো আছেই।কিশোরদের অপরাধের নৃশংসতার মাত্রা তাদের মূল্যবোধ এবং মানবিকতাবোধকে নতুন করে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে।সম্প্রতি ঘটে যাওয়া নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করে পুলিশ বলছে এরকম নিম্ন এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের কিশোররাই জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে।

চলতি জুন মাসেই চট্টগ্রাম মহানগরীতে ঘটেছে পাচঁটি হত্যাকান্ড।এসব ঘটনায় জড়িতদের বেশিভাগই কিশোর-তরুণ।যার মধ্যে চারটিতেই জড়িত ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোররাই।ঈদের পরদিন রাতে সিনেমা দেখে বাসায় ফেরার সময় হালিশহরে খুন হন দিন মজুর কিশোর মোহাম্মদ সুমন।মাত্র ৮ থেকে ১০০০০ টাকা দামের একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোনের জন্য এদের হাতে খুন হন তিনি। এ ঘটনায় ছিনতাইকৃত মোবাইল এবং হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি সহ দশ জনকে আটক করে পুলিশ।যাদের সবাই কিশোর।এছাড়া বাকলিয়ায় ঈদের পরের দিন জসীম খুনে যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারাও ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী।ঈদের দুইদিন পর নগরীর চট্টেশ্বরীতে মুনো ক্যাফে বিস্ত্রো নামে রেস্তোঁরাতে ছুরিকাঘাত করা হয় আয়মান জিহাদ নামে এক কিশোরকে।আয়মানকে ছুরিকাঘাত করতে প্রেমিক আনাস আহমেদ রুবাবকে ছুরি তুলে দেন তারই স্কুল পড়ুয়া প্রেমিকা উম্মে আয়মানশীন। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ৬ জনই কিশোর-কিশোরী।

সম্প্রতি চট্টগ্রামে স্কুলছাত্র আদনান ইসফার হত্যার ঘটনাতে কিশোর অপরাধীদের গ্রেফতার করেছে পুলিশ।অভিযোগ রয়েছে, গ্রেফতার কিশোররা ‘হিরোইজম’ বিরোধে খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে।এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারীতে নগরীর ষোলশহরে পুলিশের চেকপোষ্টে এক এস আই কে গুলি করে পালিয়েছিলো একদল কিশোর। যদিও কিশোর অপরাধ ঠেকাতে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।নজরদারী বাড়ানো হচ্ছে কিশোরদের আড্ডাস্থান এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের উপর।কিশোর অপরাধ বন্ধে গত ৬ মাস আগে চট্টগ্রাম মহানগরীর শতাধিক আড্ডার স্থান বন্ধ করে দিয়েছিল চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ।তারপরেও একের পর এক মারামারি এবং খুনের মতো ঘটনা ভাবাচ্ছে পুলিশকেও।কিশোর অপরাধ বাড়ার হারকে উদ্ধেগজনক উল্লেখ করে পুলিশ জানিয়েছে , সন্ধ্যার পর নগরীতে আড্ডায় নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে।

এছাড়াও নগরীতে অনেকদিন ধরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কিছু মোটসাইকেল যার ব্যাবহারকারী বেশীরভাগই কিশোর তরুণ।মূলত গতি এবং শব্দ দিয়ে আতংক ছড়ানোই তাদের কাজ।হর্ন বাজিয়ে, সাপের মতো এঁকেবেঁকে, মরণ গতিতে বাইক চালিয়ে দিন-রাত পাথরঘাটা, জামালখান, কাজীর দেউড়ি, নেভাল দাপিয়ে বেড়ায় তারা।কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত ব্যাবহারের ফলে কখনো ঘটছে দুর্ঘটনা কখনো বা জড়িয়ে পড়ছে ইভটিজিং, সংঘর্ষ কিংবা খুনের মতো ঘটনায়। এছাড়া মাদক ও অস্ত্র পরিবহনে ব্যাবহার হচ্ছে অবৈধ মোটরসাইকেল।কিশোর অপরাধ দমনে রাজপথ দাপিয়ে বেড়ানো এসব বাইকারদের বিরুদ্ধেও অভিযানে নেমেছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি)।সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) কুসুম দেওয়ান জানান, এ পর্যন্ত হাজারখানেক মোটর সাইকেল যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ কাগজপত্র না পাওয়া মোটর বাইক জব্দ এবং অনিয়ম পাওয়া মোটর বাইকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

সি এম পি কমিশনার জনাব মাহবুবুর রহমান কিশোর অপরাধের বিষয়ে বলেন, ‘গভীর রাত পর্যন্ত যেসব জায়গায় কিশোররা আড্ডা দেয় সেসব জায়গায় হানা দেওয়া হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবক ঢেকে তাদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়েও দেওয়া হচ্ছে।আমাদের কাজ আমরা করে যাচ্ছি তবে আমি মনে করি পরিবার থেকেও অনেক কিছু করার আছে’।

এ বিষয়ে সি এম পি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) হুমায়ুন কবির বলেন, নিম্ন এবং উচ্চ পরিবারের সন্তানরা যথাযথ কেয়ার পাচ্ছেনা।যার ফলে একটা পর্যায়ে কিশোর বয়সেই তারা বখে যাচ্ছে।

কিশোর অপরাধ বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার আসিফ মহিউদ্দিন বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই কিশোরদের বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতার অভাব আছে। তারা যে অপরাধ করছে, এই অপরাধের ফলে কী হবে সেটা তারা চিন্তা করছে না। রাজনৈতিক দলের কথিত ‘বড় ভাইদের’ কথায় অসংখ্য কিশোর অপরাধে জড়িয়ে নিজেদের জীবন নিজেরাই ধ্বংস করে ফেলছে।’

বর্তমান প্রজন্মের কিশোরদের নিয়ন্ত্রণ করতে শিক্ষক ও বাবা-মায়েরা ব্যর্থ হচ্ছে মন্তব্য করে আসিফ মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমরা স্কুল শিক্ষকদের কড়া শাসনে বেড়ে উঠেছি। আর এখনকার শিক্ষকরা তাদের ছাত্রদের মারবে দূরে থাক, ভয়ে কিছু বলতে পর্যন্ত পারে না। একেকজন কিশোর একেক রাজনৈতিক নেতার অনুসারী দাবি করে দাপিয়ে বেড়ায়। এছাড়া পারিবারিক বন্ধনটা ভালো না হলে একজন কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। পরিবারে তাকে শাসন করার কেউ না থাকলে তখন ওই কিশোরের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। অনেক কিশোর অপরাধী ধরার পর তাদের বাবা-মায়েরা আমাকে বলেছেন, তাদের দোষের কারণে সন্তান অপরাধে পা বাড়িয়েছে। তারা সন্তানের খোঁজ-খবর রাখতেন না।’

মোবাইল ও ইন্টারনেট- কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা রাখছে উল্লেখ করে তিনি বলেন,‘স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট খুবই সহজলভ্য হয়ে গেছে। কিশোরদের হাতে হাতে এখন ইন্টারনেট পৌঁছে গেছে। কিন্তু ইন্টারনেট দিয়ে ভালো ও গঠনমূলক কাজ অনেক সময় করছে না কিশোররা। ইন্টারনেটের অপব্যবহারজনিত কারণে কিশোরদের অপরাধ হচ্ছে অনেক বেশি। ফেসবুকে প্রতারণা করে ফাঁদে ফেলে টাকা আদায়সহ বহু অপরাধ হচ্ছে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তাই কিশোরদের মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রতি অভিভাবকদের নজর রাখা উচিত।’

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে আর্থ সামাজিক বৈষম্য, পারিবারিক অনুশাসনের অভাব, প্রযুক্তির অপব্যাবহার সহ নানা কারণে বাড়ছে কিশোর অপরাধ।এজন্য রাষ্ট্র এবং সমাজ ব্যবস্থাকেও দায়ী করেছেন তারা।

অপরাধ বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী জানান, অর্থনৈতিক বৈষম্য যত বেশি থাকবে এ বিষয়গুলো ততো বেশি থাকবে,এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে যদি সমাধানের ব্যবস্থা করা না হয় তাহলে শুধুমাত্র শাস্তি দিয়ে এগুলো কমানো সম্ভব নয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘কিশোরদের পরিবার সময় দিচ্ছে না। হাতে তুলে দিচ্ছে মোবাইল। ইন্টারনেটের আসক্তির ফলে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে কিশোররা। ইন্টারনেটে অপরাধের নানা কৌশল তারা শিখে যাচ্ছে। নানা পর্নো সাইটে তারা প্রবেশ করছে। এ ছাড়া যত ধরনের ভিডিও গেইম আছে প্রায় সবগুলোই যুদ্ধ, মারামারি বিষয় নিয়ে। অল্প বয়সে খুন, মারামারি এসব বিষয়ের সঙ্গে একজন কিশোর পরিচিত হয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের গেইমগুলো কিশোর মনে মারাত্মক প্রভাব বিস্তার করছে। এ ছাড়া সামগ্রিকভাবে সমাজের মধ্যে মূল্যবোধের বড় ধরনের অবক্ষয় হয়েছে। এটা কারোর অস্বীকার করার সুযোগ নেই।’

স্কুলছাত্রদের এভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘আমাদের সময়ে পড়াশোনার পদ্ধতি আর এখনকার পদ্ধতির মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। এখন ছাত্রদের গিনিপিগের মতো তৈরি করা হচ্ছে। সে বুঝে উঠতে পারছে না। আজকে একরকম ব্যবস্থা। ছয় মাস পর আবার পরিবর্তন। এই পড়াশোনার পদ্ধতিটা তার ওপর মারাত্মক প্রভাব বিস্তার করছে। এসব কারণে মানসিক অস্থিরতা বেড়ে কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।’
এছাড়া সুস্থ পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের অভাব, বাবা-মায়ের খারাপ আচরণ, চিত্তবিনোদনের অভাব, বস্তির পরিবেশ, শারীরিক ও মানসিক ত্রুটিকে কিশোর অপরাধের কারণ বলে উল্লেখ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন।

মন্তব্য করুন

comments