X

জলাবদ্ধতা নিরসন মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু চলতি মাসে

অবশেষে শুরু হচ্ছে জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পের কাজ। বর্ষা আসার মাত্র দুই মাস বাকি থাকলেও এরইমধ্যে শুরু হয়েছে বৈশাখী বৃষ্টি। জলাবদ্ধতা নিয়ে নগরবাসীর মাঝে ইতিমধ্যে নানা দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে ইতিমধ্যে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের ৫০০ কোটি টাকা অগ্রিম ছাড় দেয়া হয়েছে এবং চলতি বর্ষা মৌসুমের আগে তা খরচ করার জন্য বলাও হয়েছে। কিন্তু টাকা ছাড়ের প্রায় এক মাস হয়ে গেলেও এর কার্যক্রম শুরু হয়নি। আগামীকাল সোমবার সেই টাকা খরচের হাতেখড়ি হবে। প্রকল্পের কাজ শুরুর জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। আর এই চুক্তির জন্যই এতোদিন শুরু হচ্ছিল না কার্যক্রম।

সমঝোতা চুক্তির কথা স্বীকার করে প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএ’র নির্বাহি প্রকৌশলী আহমেদ মাঈনুদ্দিন বলেন,‘ আগামীকাল সোমবার সেনাবাহিনীর সাথে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। আর সেই চুক্তি স্বাক্ষরের পরই প্রকল্পের বাস্তব কার্যক্রম শুরু করবে সেনাবাহিনী।’

সমঝোতা চুক্তিতে উল্লেখযোগ্য শর্ত প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের কাজ করবে সিডিএ এবং প্রকল্পের নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করবে সেনাবাহিনী।

কিন্তু প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অনেক যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হবে। আগে এসব কাজ করতো সিটি করপোরেশন।

এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজাউল মজিদ বলেন, যন্ত্রপাতি কোনো বিষয় নয়, আমাদের কাছে না থাকলে প্রয়োজনে আমরা ভাড়ায় নিবো অথবা কিনবো। তবে সবার আগে আমাদের মাঠে নামতে হবে। মাঠে নামার পরই বলা যাবে কোথায় কোন ধরনের যন্ত্রপাতি লাগবে।

সিডিএ থেকে বলা হচ্ছে ১৬টি খালের খনন ও সম্প্রসারণের কাজ প্রথমে শুরুর কথা, বাস্তবে কোন পদ্ধতিতে এগুবেন জানতে চাইলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজাউল মজিদ বলেন, ‘১৬ বা ২০ কোনো বিষয় নয়। মাঠে নামার পর যেভাবে কাজ করলে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ কমিয়ে আনা যায় এবং রাস্তা থেকে নালায়, নালা থেকে খালে এবং খাল থেকে নদী বা সাগরে নিয়ে যাওয়া যায় সেভাবেই আমরা কাজ করবো।’

এদিকে অপর এক সূত্রে জানা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য তিনটি লং বুম স্কেভেটর, ৫টি শর্ট বুম স্কেভেটর, একটি পে লোডার, একটি বুলডোজার, একটি স্টিল রোড রোলার, একটি টায়ার রোলার কেনা হতে পারে।

সিডিএ সূত্রে জানা যায়, জলাবদ্ধতা নিরসনে সবার আগে আগ্রাবাদ-হালিশহর, বাকলিয়া-চান্দগাঁও ও মুরাদপুর-বহদ্দারহাট এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে নজর দেয়া হচ্ছে। প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের অধীনে ৩৬ খাল খনন ছাড়াও ৪৮ গার্ডার ব্রিজ, ৬ কালভার্ট, ৩৬ খালে ৪২ সিল্ট ট্র্যাপ , ৫ খালের মুখে টাইডাল রেগুলেটর, খালের উভয় পাশে থাকবে ১৫ ফুট চওড়া রোড এবং আর এস শিট অনুযায়ী খালের উভয় পাশের জায়গা উচ্ছেদের কথা থাকলেও প্রাথমিকভাবে আসন্ন বর্ষা মৌসুমের জন্য ১৬ খাল নিয়েই এগুচ্ছে সংস্থাটি। ইতিমধ্যে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে সিডিএ’র মেগা প্রকল্পে ওভারলেপিং হতে পারে সেই আশঙ্কায় নগরীর খাল খনন কিংবা অবৈধ দখল উচ্ছেদে কাজ করবে না সিটি করপোরেশন।

বর্ষা আসন্ন, এখনো পুরোদমে খাল খনন ও সংস্কার কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় জলাবদ্ধতা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়ে সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী এম আলী আশরাফ বলেন, এবার আমাদেরকে অনেকগুলো যদি’র উপর নির্ভর করতে হবে। যদি বৃষ্টি না হয়, আর বৃষ্টি হলেও যাতে মুষলধারে দীর্ঘক্ষণ বৃষ্টি না হয়, আর বৃষ্টি হলেও যাতে সাগরে জোয়ার না থাকে তাহলে হয়তো জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। অন্যথায় এবারের জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ অতীতের চেয়ে কম হবে না।

তবে সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, যদি মাঠ পর্যায়ে সকলের সহযোগিতা নিয়ে এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ শুরু করা যায় তাহলে হয়তো জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ আগের চেয়ে কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব।

প্রকল্প নিয়ে জনমনে শঙ্কা এবং কাজ শুরু হলেও জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ থেকে নগরবাসী মুক্তি পাবে কিনা তা নিয়েও সন্দিহান নগরবাসী। এই সন্দেহের বিষয়ে জানতে চাইলে সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, ‘নগরবাসীর মধ্যে এই সন্দেহ থাকা অমূলক নয়। জলাবদ্ধতার প্রকল্পের কাজ শুরু হচ্ছে কিনা এটা নগরবাসীর প্রথম সন্দেহ। আর প্রকল্পের কাজ শুরু হলে সন্দেহ দূর হয়ে যাবে এবং নগরবাসীর মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা যাবে। অতীতে একসাথে অনেক প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হলেও শেষ না হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে নগরবাসীর। সেকারণে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কিংবা সন্দেহ থাকতে পারে, এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু মাঠ পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা হতে পারে এমন জল্পনা কল্পনা চলছে। এবিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, ‘প্রকল্পটি সকল সংস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে করার জন্য একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটিতে সব সংস্থার প্রতিনিধি রয়েছে। এছাড়া মিটিংয়ে সবাই উপস্থিত থাকছেন। তাই প্রকল্প সম্পর্কে কেউ জানে না তা বলার সুযোগ নেই। সকলের সমন্বয়ের মাধ্যমেই প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। প্রথম দফায় হয়তো পুরোপুরি সুফল পাওয়া যাবে না, তবে আগামীতে অবশ্যই সুফল মিলবে। আর এবছর নগরবাসীকে কিছু দৃশ্যমান উন্নতি দেখাতে আমরা অবশ্যই কিছু একটা করবো।’

উল্লেখ্য, বৃষ্টি হলেই ডুবে যায় নগরীর বিভিন্ন এলাকা। কখনো সাগর থেকে আসা জোয়ারের পানির প্রভাবে, আবার কখনো অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে, কখনো সড়ক থেকে নালা ও খালে পানি আটকে যাবার কারণে। যে কারণেই হউক পানিবন্দি থাকে নগরবাসী। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে গত বছরের গত ৯ আগস্ট একনেকে (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহি কমিটি) ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয়। প্রকল্পের আওতায় নগরীর ৩৬টি খাল আরএস শিট অনুযায়ী পূর্বের অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি, খালের উভয় পাশে ১৫ ফুট চওড়া রোড ও খালের মুখে ৫টি স্লুইস গেইট বসানো, সিল্ট ট্র্যাপ ও জলাধার নির্মাণ, ৩৬টি খাল খননের মাধ্যমে ৫ লাখ ২৮ হাজার ২১৪ ঘনমিটার মাটি উত্তোলন, ৪২ লাখ ঘনমিটার কাদা অপসারণ, নতুন করে ১০ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ, ১ লাখ ৭৬ হাজার মিটার দীর্ঘ রিটেনিং দেয়াল নির্মাণ এবং খালের উভয় পাশে ৮৫ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করা।

মন্তব্য করুন

comments