চট্টগ্রামে যুবককে অ্যাসিড নিক্ষেপ;স্বামী-স্ত্রী গ্রেফতার

177
শেয়ার

চট্টগ্রামে এসিড ছুড়ে তমাল চন্দ্র দে (২৫) নামে এক যুবকের দুই চোখ নষ্ট করে দেওয়ার অভিযোগে স্বামী-স্ত্রী দুজনকে ঢাকার ভাটারা থেকে গ্রেফতার করেছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। এরা হলেন, সুমিত দত্ত (২৬) এবং মৌমিতা দত্ত অ্যানি (২৪)।

শুক্রবার (৩০ মার্চ) রাজধানীর ভাটারা থানার ভাড়া বাসা থেকে এই দম্পতিকে গ্রেফতার করে চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। শনিবার সকালে তাদের চট্টগ্রামে আনা হয়।

চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপ-পুলিশ কমিশনার হাসান মো: শওকত আলী গণমাধ্যমকে গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানাধীন গুডস হিলের সামনে ২০১৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি প্রেমঘটিত কারণে এসিড হামলার শিকার হন তমাল চন্দ্র দে। তিনি পটিয়া উপজেলার কেলিশহর এলাকার বাবুল চন্দ্র দে’র ছেলে। বাবুল চন্দ্র দে চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের কর্মকর্তা। এসিডে আক্রান্ত হয়ে তমালের এক চোখ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। আরেকটি চোখও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া তার মুখমণ্ডলও বিকৃত হয়ে গেছে।

ডিবি পরিদর্শক রাজেশ কান্তি বড়ুয়া বলেন, তমালের সঙ্গে মৌমিতার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। একই সময়ে মৌমিতা সুমিতের সঙ্গেও সম্পর্কে জড়ায়। মৌমিতা ও সুমিত গোপনে আদালতের মাধ্যমে বিয়ে করে। বিষয়টি জানার পর তমাল মৌমিতাকে চড় মারে। এই চড়ের প্রতিশোধ নিতে তমালকে কৌশলে ডেকে নিয়ে মুখে এসিড মারে।

এসিড নিক্ষেপের ঘটনাটি ঘটেছে ২০১৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নগরীর কোতয়ালী থানার রহমতগঞ্জে গুডস হিলের পাশে। ঘটনার পর ২৩ ফেব্রুয়ারি তমালের বাবা বাবুল চন্দ্র দে বাদি হয়ে মৌমিতা-সুমিত এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করে একটি মামলা করেন।

অভিযুক্ত মৌমিতা দত্ত অ্যানি ও তার স্বামী সুমিত দত্ত উভয়ই প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। স্নাতক পাস তমালের দূর সম্পর্কের আত্মীয় মৌমিতা।

তমাল জানান, ২০১৫ সালে তমাল ও মৌমিতার মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠে। এক বছর পর তমাল জানতে পারে, সে সুমিতের সঙ্গে ৫ বছর ধরে প্রেম করে আসছে।

বিষয়টি শোনার পর তমাল মৌমিতাকে একটি রেস্টুরেন্টে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে মৌমিতা সুমিতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি স্বীকার করে এবং তাদের কোর্ট ম্যারেজ হয়েছে বলেও জানায়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মৌমিতাকে চড় মারেন তমাল। তখন মৌমিতার কান্না দেখে সুমিতকে দেখে নেয়ার হুমকি দেয় তমাল।

এই ঘটনার মাসখানেক পর প্রজাপতির ডানা নামে একটি ফেসবুক আইডি থেকে বন্ধু হবার আমন্ত্রণ পান তমাল। নিয়মিত কথাবার্তার এক পর্যায়ে তাকে ওই আইডি থেকে তমালকে দেখা করার অনুরোধ করা হয়।

সাক্ষাতের জন্য তমাল রহমতগঞ্জে গুডস হিলের কাছে গেলে এক যুবক তার মুখে এসিড ছুড়ে মারে। তমালের দাবি, ওই যুবকই মৌমিতার স্বামী সুমিত।

এর আগে, ২০১৭ সালের ৫ মে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসিড হামলায় দুটি চোখ হারানো তমাল সাংবাদিকদের জানান, আমাকে ডেকে নিয়ে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে এসিড ছোড়া হয়েছিল।আমি দু’জনকে দেখেছিলাম। তারা অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকিয়েছিল। এরপর আরেকজন যুবক গরম কিছু আমার মুখে নিক্ষেপ করে। ঝাপসা চোখে দেখেছিলাম পরনে চেক শার্ট, গড়ন অ্যানির স্বামী সুমিতের মতো। আমি অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে যখন পানি পানি চিৎকার করছিলাম তখন একজন যুবক বলছিল- ‘অ্যানির সঙ্গে প্রেম করার মজা দেখ।’

তমালের মা অর্চনা রাণী দে ওই সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আমার ভাসুরের মেয়ের বিয়েতে যাওয়ার পর তমালের সঙ্গে অ্যানির আলাপ-পরিচয় হয়। ওরা ৩-৪ মাস একসঙ্গে ঘোরাফেরা করে। কিন্তু তারও ৫ বছর আগে থেকে আরেকটি ছেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল মেয়েটির।

অর্চনা রাণী দে আরো বলেন, এই বিষয়টি নিয়ে তমালের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছিল তার। পরে তমাল রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে তাকে থাপ্পড় মেরেছিল। সেই থাপ্পড়ের জবাব তারা দিয়েছে এসিড মেরে! এই এসিড হামলায় আমার ছেলে তার দুটি চোখ হারিয়েছে। পুরোপুরি ভাবে চোখ দুটি নষ্ট হয়ে গেছে।

ডিবি পরিদর্শক রাজেশ জানান, ঘটনার পর সুমিত ও মৌমিতা গ্রেফতার এড়াতে ঢাকায় চলে যান। সেখানে মৌমিতা একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। সুমিত কয়েকটি টিউশন নেন। এভাবেই তাদের সংসার চলছিল।

মন্তব্য করুন

comments