X

শঙ্খের ভাঙন; বদলে যাচ্ছে দক্ষিন চট্টগ্রামের মানচিত্র

শঙ্খের ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা

শঙ্খ নদী ভাঙনে দক্ষিন চট্টগ্রামের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক গ্রাম। সম্প্রতি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার চরতী ও আমিলাইষ ইউনিয়নে শঙ্খের ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। তাছাড়া যে কোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে এ এলাকার গুরুত্বপূর্ণ মোলভীর দোকান-চাঁদপুর সড়ক।

আমিলাইষ, চরতী ও দ্বীপ চরতী এলাকায় গত ১৫ দিনে আমার প্রতিবেশী ২০টি পরিবার বসতঘর হারিয়েছে। আর গত এক মাসে প্রায় আড়াই শ বসতঘর নদের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের মুখে হুমকিতে রয়েছে আরও দুই শতাধিক বসতঘর।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিবছর বর্ষা শুরু হলে এই দুই ইউনিয়নের শঙ্খপাড়ের বাসিন্দাদের দিন কাটে আতঙ্কের মধ্য দিয়ে। প্রতিবছরই নদের ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বসতঘর ও ফসলি জমি। উপজেলার চরতী ইউনিয়নের উত্তর তুলাতুলি, তুলাতুলি, মধ্যম চরতী, উত্তর ব্রাহ্মণডাঙ্গা, দক্ষিণ ব্রাহ্মণডাঙ্গা ও দ্বীপ চরতী এলাকায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটারে কেবলই নদের ভাঙনের চিহ্ন।

শঙ্খের ভাঙ্গনের কবলে দক্ষিন চট্টগ্রামের চার উপজেলা

দক্ষিণ চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত খরস্রোতা নদী শঙ্খ। দক্ষিণ চট্টগ্রামের দুঃখ বলে খ্যাত বান্দরবান থেকে নেমে আসা এই নদী। কেউ বলে শঙ্খ কেউ বলে সাঙ্গু। বান্দরবান জেলা ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া-চন্দনাইশ হয়ে আনোয়ারা ও বাঁশখালী উপজেলা দিয়ে শঙ্খ নদী বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে।

শঙ্খ নদীর ভাঙনে এর আগেও দক্ষিন চট্টগ্রাম তার মানচিত্র হারিয়েছে তার অনেক ইউনিয়নে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া উপজেলার সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রবাহিত শঙ্খ নদী দুই উপজেলার মোট ১২টি ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রাম গ্রাস করে চলেছে।

চন্দনাইশ উপজেলার বরমা ইউনিয়ন, বৈলতলী, দোহাজারী চাগাচর, চর বরমা ও ধোপাছড়ির অনেক এলাকা শঙ্খনদীর ভাঙ্গনে ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ। প্রতি বছর এভাবে শঙ্খনদীর ভাঙ্গনে চন্দনাইশের মানচিত্র ছোট হয়ে যাচ্ছে। গত বর্ষা মৌসুমে ২০টি ঘরবাড়ি, কবরস্থান ও বেশকিছু ফসলি জমি শঙ্খনদীর ভাঙ্গনে তলিয়ে যায়। এর আগে ৪০টি ঘর, ১টি মসজিদ ও ১টি কবরস্থানসহ চর বরমার বিশাল এলাকা শঙ্খ নদীতে তলিয়ে যায়।

সাতকানিয়া উপজেলার পুরানগড়, বাজালিয়া, ধর্মপুর, কালিয়াইশ, খাগরিয়া, নলুয়া, আমিলাইষ ও চরতী শঙ্খ নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ। গত চার দশকে ইউনিয়নগুলোর অধিকাংশ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। উপজেলার চরতী ইউনিয়নের উত্তর তুলাতুলি, তুলাতুলি, মধ্যম চরতী, উত্তর ব্রাহ্মণডাঙ্গা, দক্ষিণ ব্রাহ্মণডাঙ্গা ও দ্বীপ চরতী এলাকায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটারে কেবলই নদের ভাঙনের চিহ্ন। উত্তর তুলাতুলি-ঘাটঘর সড়কটির অন্তত আধা কিলোমিটার নদের বুকে হারিয়ে গেছে।

আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের মধ্যম বারখাইন ও তৈলারদ্বীপ গ্রামে শঙ্খের ভাঙনে বিলীন হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। সূত্রমতে, গত ছয় বছরে শঙ্খের ভাঙনে গ্রাম দুটির ৭০০ এর অধিক ঘর বিলীন হয়েছে। উপজেলার জুঁইদন্ডী লামার বাজার, খুরুসকুল গোদারপাড়, সোলতান আহমদ চৌধুরী হাট, সাপমারা খালের মুখ ও চর জুঁইদন্ডী এলাকার কয়েকশ’ পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে।

বাঁশখালী উপজেলার পুকুরিয়া ইউনিয়নটি শঙ্খ নদীর ভাঙনের ফলে দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। বিগত দিনে শঙ্খ নদীর ভাঙনের ফলে উত্তর পুকুরিয়া, পশ্চিম পুকুরিয়া, দক্ষিণ বরুমচড়া এলাকার প্রায় সহস্রাধিক বাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এছাড়া সাধনপুর ইউনিয়নে শঙ্খ নদীর ভাঙনের কবলে পড়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে অনেক কিছু বিলীন হয়ে যায়। কিছুদিন আগে ভাঙনের কবলে পড়ে পশ্চিম বৈলগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিগত বছরগুলোতে শঙ্খের ভাঙন প্রতিরোধে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় ভাঙন অপ্রতিরোধ্য হয়েছে। ভাঙ্গনরোধে এলাকাভিত্তিক বরাদ্দ থাকলেও পরিকল্পনার অভাব ও সময় অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করতে না পারার কারনে এ সমস্যা থেকেই যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ক্ষতিগ্রস্থরা জরুরি ভিত্তিতে ভাঙনকৃত এলাকায় বাঁধ নির্মাণসহ গৃহহারা মানুষের যথাযথ স্থায়ী ভাবে বসবাস করার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরী করার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। সাতকানিয়ার সাম্প্রতিক ভাঙ্গনের কবলে পড়া বাসিন্দারা আপাতত ব্যক্তিগত উদ্যোগে জিআই ব্যাগ কিনে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করছেন।

এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পটিয়া কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী অনুপম দাশ জানিয়েছেন, স্থানীয় সাংসদ আবু রেজা নদভীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শঙ্খ নদের ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। শঙ্খ নদের ভাঙনকবলিত প্রায় ছয় কিলোমিটার এলাকায় অতিগুরুত্বপূর্ণ স্থানে আরসিসি ব্লক বসানোর একটি প্রকল্প তৈরি করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

মন্তব্য করুন

comments