X

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়গামী যানজটমুক্ত যাতায়াত অবকাঠামো ও শিক্ষণবান্ধব পরিবেশ

মোস্তাফা কামাল যাত্রা

জন্মের পর থেকে চট্টগ্রাম নগরীতে বসবাসের কারণে নাগরিক জীবনের নানান ঘাত-প্রতিঘাত এর ৪ দশকের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে আজকের লিখনির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের একটি জনস্বার্থমূলক প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণে ব্রতী হয়েছি।
আগামী ১৮ নভেম্বের ২০১৬ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়- এর ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নগরী এবং ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক সুবর্ণ জয়ন্তী উদ্‌যাপনে আয়োজিত ২দিন ব্যাপী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রাক্তন শিক্ষার্থী, তাদের পরিবারের সভ্য এবং শিক্ষামোদীদের সমাবেশ ঘটবে। যা যেমন আনন্দের তেমনি এক বিষাদময় অভিজ্ঞতার জন্ম দেবে।
বিষাদময় বলে চিহ্নিত করছি এই কারণে যে- বিশ্ববিদ্যালয়গামী এক বিশাল সংখ্যক উপস্থিতির যাতায়াত প্রসংগ বিবেচনায় নিয়ে। ভর্তি পরীক্ষার সময় এই সংক্রান্ত স্মৃতি আমাকে এই লিখনি সম্পাদনে উদ্দীপ্ত করেছে।
তদুপরি নগরীর একজন স্থায়ী অধিবাসী হিসাবে শহরের বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে পড়লেও প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে যেমনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায়শই যাতায়াত ঘটতো। এছাড়াও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯১-৯২ সেশনে অনার্স কোর্সে ভর্তি হয়ে সেশন জটের কারণে মাষ্টার্স কোর্স সম্পন্ন করে বের হয়েছিলাম ১৯৯৮ খৃষ্টাব্দে। তারপর বাংলা বিভাগের অধিনে এম. ফিল. কোর্সের শিক্ষার্থী হিসেবে ক্যাম্পাসে নিয়মিত গমনাগমন। সব মিলিয়ে ১ দশকেরও ঊর্ধ্বে সময়কাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার প্রাত্যাহিক তথা নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াতের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
পৈত্রিক বাড়ি নগরীর ঝাউতলা ষ্টেশন সংলগ্ন হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে গমনাগমনে শাটল ট্রেনই ব্যবহার করেছিলাম বেশি। বাস রুটও ব্যবহার করেছি অনেকবার। দীর্ঘ ১৫ বছর বিরতি দিয়ে পেশাগত কারণে নাট্যকলা বিভাগের একজন শিক্ষাকর্মী হিসাবে ক্যাম্পাসে পুনরায় নিয়মিত যাতায়াতের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় একজন প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী হিসাবে আলোচ্য প্রসংগ আলোকপাতের জন্য কলম ধরা।
মূলত: চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ নভেম্বর’ ১৬ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য পরিকল্পিত অনুষ্ঠানমালায় যোগদানে আগতদের গমনাগমন প্রসঙ্গের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা উপলব্ধি করতে গিয়েই আমার এই প্রতীতি জন্মেছে যে- এই ইস্যুতে আলোচনার সূত্রপাত ঘটনো অতিব জরুরি। যার সাথে দীর্ঘ মেয়াদী অবকাঠামো ও শিক্ষণক্রিয়া সম্পৃক্ত।
নাট্যকলা বিভাগে যোগদানের সুবাদে আমাকে ব্যবহার করতে হয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পরিবহনে ব্যবহৃত ৪ নং রুটের বাসটি। যা সকাল ৮ টায় হালিশহর থেকে যাত্রা আরাম্ভ করে এ.কে.খান মোড় হয়ে জাকির হোসেন সড়ক ধরে ২ নং গেইট হয়ে অক্সিজেন মোড় পেরিয়ে হাটহাজারী সড়ক দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পৌঁছানোর কথা সকাল ৯ টায়। অর্থাৎ ১ ঘন্টার যাত্রাপথ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো খুব কম দিনই বাস নির্ধারিত সময়ে ক্যাম্পাসে পৌছাতে সমর্থ হয়েছে।
তার মূল কারণ জাকির হোসেন সড়কস্থ ২টি রেল ক্রসিং এবং ২ নং গেইট থেকে অক্সিজেন মোড়ের মধ্যবর্তী সড়কের ২টি রেল ক্রসিং। যা বায়েজিদ বোস্তামী সড়ক হিসাবে পরিচিত। আমি জাকির হোসেন সড়কস্থ ভারতীয় দূতাবাস সংলগ্ন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক ড.এ.এফ. আওরঙ্গজেব স্যারের বাস ভবনের সামনে থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়গামী বাসে উঠি। সকাল ৮টা ১০ মিনিটের মধ্যে বাসটি সেখানে পৌঁছানোর কথা থাকলেও তা ৮টা ৪০ মিনিটে পৌঁছাতেও ব্যার্থ হয়ে থাকে। যার প্রধান কারণ হচ্ছে ইতোপূর্বে উল্লেখিত রেল ক্রসিংদ্বয়। একটি ঢাকাগামী রেল লাইন অন্যটি নাজিরহাটগামী রেল লাইন। দ্বিতীয় রেল লাইন ব্যবহার করে ক্যাম্পাসমুখী শাটল ট্রেনও যাতায়াত করে থাকে।
ফলে উক্ত রেল ক্রসিং ২টি পার হয়ে নির্ধারিত সময়ে বাসটি উল্লেখিত স্থানে পৌঁছানোটা আশা করা একটি অলিক স্বপ্ন মাত্র। কিন্তু বাসে যাতায়াত করবেন বলে সম্মানিত শিক্ষকদের ৮টা ১০মিনিটের পূর্বে ভারতীয় দূতাবাসের সামনে পৌঁছাতে হয়। এই স্পট থেকে প্রতিদিন ৭/৮ জন শিক্ষক বাসে উঠেন আমারই মত। যারা আশে পাশের এলাকায় বসবাস করেন। তাই নিশ্চয়ই ন্যূনতম ৭টা ৩০মিনিটের পূর্বেই শিক্ষকমন্ডলিদের স্ব-স্ব বাসা থেকে বের হতে হয়। নগরীর ২নং গেইট পর্যন্ত এই রুটের বাসে গড়ে প্রতিদিন ২০/২৫ জন শিক্ষক উঠা-নামা করেন। তাদেরও নিশ্চয়ই একই ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
যেই বাস ৯টায় ক্যাম্পাসে পৌঁছার কথা। সেই বাস ৯টায় ২নং গেইটে পৌঁছাতে পারলেও বায়েজিদ বোস্তামী সড়কস্থ অপর ২টি রেল ক্রসিং পেরিয়ে অক্সিজেন পৌঁছাতেই ৯ টা ৩০ মিনিট হয়ে যাওয়া অবান্তর নয়। ১ টি রেল ক্রসিং-এ ১০ মিনিট করে হলে অক্সিজেন পৌঁছাতে ৪০মিনিট কেবলমাত্র ৪টি রেল ক্রসিং জনিত কারণেই নষ্ট হওয়াটাই অবধারিত সত্য। ফলে আমার মতো এই রুটের সকল শিক্ষকদেরই ৯ টা ৩০মিনিটের নির্ধারিত ক্লাসের সময় ৪ নং বাসেই শুরু হয়ে যায়।
এমন পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে গিয়ে যে সব কার্যকারণকে দায়ি করতে হবে তার মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে রেল ক্রসিং-এ নষ্ট হওয়া ৩০ থেকে ৪০মিনিট সময়। জাকীর হোসেন সড়কস্থ ঝাউতলা রেল গেট, বায়েজীদ বোস্তামী সড়কস্থ ২টি রেল গেইটে প্রধানত বিশ্ববিদ্যালয়গামী শাটল ট্রেনের পারাপারের জন্যেই আলোচ্য সময় খ্যাপন হয়ে থাকে। শিক্ষকদের এই পরিস্থিতির শিকারে পরিণত হতে হয় ফিরতি পথেও। ফলশ্রুতিতে ক্যাম্পাস থেকে ছেড়ে আসা ১ টা ৩০ মিনিটের বাস হালিশহর পৌছাতে সময় লাগে ৩.৩০মি থেকে ৪ টা পর্যন্ত। অর্থাৎ দুই থেকে আড়াই ঘন্টা!
শিক্ষকদের পরিবহণে ব্যবহৃত বাসগুলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত না হওয়ায় সামগ্রিক যানজট পেরিয়ে ক্যাম্পাসে পৌঁছে একজন শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে মানসম্মত পাঠদান করতে পারেন বলে আমার মনে হয় না। কারণ গরম ও বিরক্তিকর ধীরগতির যাত্রাপথ শিক্ষকদের শিক্ষণ মানসিকতায় সৃষ্টি করে নেতিবাচক মনোভাব। এছাড়াও নির্ধারিত সময়ে ক্লাস শুরু না করার মত ঘটনাতো ঘটছেই প্রতিনিয়ত। এতে করে পরিকল্পিত সময়ে একজন শিক্ষকের পক্ষে নির্ধারিত কোর্স পাঠ্যসূচীও সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।
তাই দ্রুততম সময়কালের মধ্যেই শিক্ষণবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে শিক্ষক বাসগুলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযুক্ত করা যেমন প্রয়োজন তেমনি ক্যাম্পাস অভিমুখী যানজট মুক্ত যাতায়াত অবকাঠামো গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের যৌক্তিক ও দায়িত্বশীল উদ্যোগ প্রত্যাশা করছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ১৯ নভেম্বও ২০১৬ ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক আয়োজনে প্রাপ্ত তথ্যমতে অর্ধ শতাধিক সচিব ও উপ-সচিব মহোদয়গণসহ শিক্ষা ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ যোগ দেবেন। তারা ব্যক্তিগত বা সরকারী গাড়ীতে ক্যাম্পাসে পৌঁছালেও গণপরিবহন ব্যবহার করে যারা ঐ দিন ক্যাম্পাসে যাতায়াত করবেন তাদের কষ্টকর ও নিরানন্দ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা উপলব্ধি করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়গামী যানজটমুক্ত যাতায়াত অবকাঠামো গড়ে তুলতে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি প্রস্তাবনা দিয়ে এই লিখনির ইতি টানবো।
আমার প্রস্তাবনাটি হচ্ছে: নাজিরহাটগামী রেল লাইন ব্যবহার করেই যেহেতু, শাটল ট্রেন চলাচল করে এবং বটতলী স্টেশন থেকে প্রায় ছোট বড় ১০টি রেল গেইট অতিক্রম করে শাটল ট্রেনকে ক্যাম্পাসে যেতে হয়। তার মধ্যে কদমতলী, আমবাগান, ঝাউতলা এবং ২নং গেইটের রেল ক্রসিং জনিত সৃষ্ট যানজট থেকে নগরীকে মুক্ত করতে প্রাথমিক পর্যায়ে শাটল ট্রেন অবশ্যই বটতলীর পরিবর্তে অস্থায়ীভাবে ষোলশহরকে প্রারম্ভিক রেল স্টেশন হিসাবে চালু করা। এছাড়া দ্রুততম সময়ের মধ্যে পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট সম্মুখস্থ স্টেশনটি শাটল ট্রেন ছাড়ার জন্য একটি স্থায়ী সাব স্টেশন হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা। সেই সাথে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ পার্শ্বের সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে একটি নতুন রেল লাইন শ্রম মন্ত্রণালয়য়ের বিভাগীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সামনে দিয়ে বিকল্প রেল সড়ক হিসাবে চালু করে সেই সড়ক পথ ধরে বায়েজিদ বোস্তামী মাজারের পেছন দিয়ে কেন্টনম্যান্ট স্কুল এন্ড কলেজের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের রূপকার মাস্টারদার স্মৃতিধন্য জালালাবাদ পাহাড়ের পাশ দিয়ে পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয় তথা নাজিরহাটগামী রেল সড়ক যুক্ত করা। নতুন এই রেল পথের দূরত্ব ৩ কি.মি এর অধিক নয়। তাহলে শাটল ট্রেনজনিত যানজট থেকে নগরী যেমন মুক্ত হবে; তেমনি ক্যাম্পাসগামী যাতায়াত সময় কমে যাবে অর্ধ ঘন্টা!
যদি উক্ত স্বল্প দূরত্বের বিকল্প রেল পথ স্থাপন করা যায় এবং পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্টেশন থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়গামী শাটল ট্রেন-এর প্রারম্ভিক স্টেশন অবকাঠামো গড়ে তোলা যায় তবে নগরীর উপর যেমন যানজটের চাপ কমবে তেমনি ২৫মিনিটের মধ্যে নগরী থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রেল যোগে পৌঁছানো সম্ভব হবে। যা শাটল ট্রেন ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের যেমন সময় বাঁচাবে তেমনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেন খাতে ব্যয় অর্ধেকে নেমে আসবে। সেই সাথে ক্যাম্পাসগামী শিক্ষার্থীদের পরিশ্রমী যাতায়াতের কষ্ট ও প্রাত্যহিক ব্যয় কমে যাবে। যা তারা তাদের শিক্ষাব্যয় এবং শিক্ষণের গুণগত মান বৃদ্ধিতে কাজে লাগাতে পারবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণ জয়ন্তীর এর শুভক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এই প্রসঙ্গে মনোযোগ আকর্ষণ করছি। যাতে করে শাটল ট্রেনের উৎপাত মুক্ত একটি যাতায়াত ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি যানজটমুক্ত নগরী প্রতিষ্ঠার সময় উপযোগী ও যৌক্তিক অবস্থান নিশ্চিত করতে স্ব-স্ব ক্ষেত্র থেকে অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।

মন্তব্য করুন

comments