X

বহুমুখী সংকটের শিকার নগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থা

ছবিঃ সংগৃহিত

ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনসংখ্যায় দ্রুতবর্ধিষ্ণু চট্টগ্রাম মহানগরীতে বহুমুখী সংকটের শিকার গণপরিবহন ব্যবস্থা। যানজটের পাশাপাশি যাত্রীর সংখ্যার তুলনায় গণপরিবহনে ব্যবহূত যানবাহনের সংখ্যা কম হওয়ায় প্রতিদিনই বিপুল সংখ্যক যাত্রীদের যাতায়াতের সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে।

প্রতিদিন সকালে নগরীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা, অফিস-আদালত এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে পরিমাণ চাকুরীজীবী, কর্মজীবী-শ্রমিক এবং ছাত্র-ছাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছাতে হয় তার তুলনায় গণপরিবহনের সংখ্যা গত এক দশকে তেমন একটা বাড়েনি।

সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংক আয়োজিত এক কর্মশালায় জানানো হয়, চট্টগ্রাম নগরের রাস্তায় চলাচল করা গাড়ির মধ্যে ৯২ শতাংশই ছোট আকৃতির (রিকশা, অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ি)। এসব গাড়ি যাত্রী পরিবহন করে মাত্র ৩০ শতাংশ। বাকি ৭০ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করে গণপরিবহন। অথচ মোট গাড়ির মাত্র ৮ শতাংশ গণপরিবহন।

বিশ্বব্যংক আয়োজিত ঐ কর্মশালায় বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম নগরের মূল সড়কগুলোয় গণপরিবহনের চেয়ে অযান্ত্রিক যানবাহনের (রিকশা, ভ্যান ইত্যাদি) সংখ্যা বেশি। এটি যানজটের অন্যতম কারণ। নগরের যানজট নিরসনের জন্য প্রয়োজনে মূল সড়ক থেকে অযান্ত্রিক বাহন তুলে দেওয়ার মতো অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ট্রাফিক সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরীতে ১৩ টি বাস রুট ও ১৬ টি হিউম্যান হলারের রুট রয়েছে। নগরীর যানজট নিরসন ও পরিবহন সংকট কমাতে বড় বাসভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থা তৈরির উপর দিচ্ছেন তারা। পাশাপাশি বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি চালু পরামর্শ তাদের। বন্দর আর শিল্প নগরী হিসেবে চট্টগ্রামে দিনে দিনে যেমন বাড়ছে মানুষের চাপ। তেমনি বাড়ছে যানজট। নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে এখন দিনের অধিকাংশ সময় যানজটে নাকাল হয় মানুষ।

এদিকে, চট্টগ্রাম নগরের ট্রাফিক ব্যবস্থার চরম বিশৃঙ্খলায় কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন গণপরিবহনের সব বাসকে একই ছাতার নিচে আনার কথা বলছেন। গত শুক্রবার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, নগরের যাত্রীবাহী বাসগুলোর পরিচালনব্যবস্থা একটি ব্যবস্থাপনা কমিটির আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। তাতে নগরে যানজট সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে।

তিনি বলেন, ‘নগরীর সব গণপরিবহন একই ম্যানেজমেন্টের আওতায় আনা হলে আনহেলদি কম্পিটিশন থাকবে না। চালক-শ্রমিকদের মজুরি, জ্বালানি, আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে ম্যানেজমেন্ট গণপরিবহন মালিকদের সিট অনুযায়ী লাভের অর্থ বণ্টন করতে পারে। পরিবহন মালিকদের আমরা এ প্রস্তাব দিয়েছি। এতে নগরবাসী উপকৃত হবে।’

মেয়র আরো বলেন, ‘গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে আমি একটি ব্যবস্থাপনার কথা বলেছি। এর দায়িত্বে পরিবহন মালিকেরা থাকবেন। তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে আমরা এখানে সম্পৃক্ত করতে চাই না।’

বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরে পরিবহন মালিকদের ৯টি সমিতি ও জেলায় ১৮টি সমিতি রয়েছে। প্রতিটি সমিতি তাদের নিজস্ব নিয়মে বাসগুলো পরিচালনা করে। একটির সঙ্গে অন্যটির সমন্বয় না থাকায় প্রতিদিন বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে। নগরের সড়কগুলোর মোড়ে বাস দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠা-নামা করে। পেছনের বাসগুলোকে আটকে রাখতে সামনের বাসের চালক নিজেরটা আড়াআড়িভাবে দাঁড় করায়।

এতে পেছনের অন্য গাড়িও আটকে যাচ্ছে। এটি যানজটের অন্যতম কারণ। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে মোড় থেকে কিছু দূরে যাত্রীছাউনি করার পাশাপাশি একই ব্যবস্থাপনায় বাস পরিচালনার উদ্যোগ নেন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।

নতুন ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি মোড়ের অদূরে যাত্রীছাউনির কাউন্টার থেকে টিকিট করে উঠবে যাত্রীরা। দিন শেষে টিকিট বিক্রির অর্থ যোগ করে আসনের সংখ্যা অনুপাতে বাসের মালিকদের টাকা দেওয়া হবে। ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সেনাবাহিনী পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আনতে এ রকম একটি উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে এটি বাস্তবায়নের পর্যায়ে রাজনৈতিক সরকার এলে এই উদ্যোগ চাপা পড়ে যায়।

তবে পরিবহন খাতের চাঁদাবাজেরা মেয়রের এই উদ্যোগে প্রধান বাধা মনে করছেন পরিবহন মালিক সংগঠনের নেতারা। তাঁরা জানান, একই ব্যবস্থাপনায় গণপরিবহন পরিচালিত হলে মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষ লাভবান হবে। কিন্তু চাঁদাবাজেরা তা বাস্তবায়ন করতে দেবে কিনা সন্দেহ।

চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের যুগ্ম মহাসচিব গোলাম রসুল জানান, নগরের একটি বাস থেকে প্রতিদিন ১০০-১২০ টাকা চাঁদা নেওয়া হয়। তবে তিনিও চাঁদবাজদের পরিচয় সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু বলেননি।

চাঁদাবাজি সম্পর্কে ট্রাফিক পুলিশের উপকমিশনার সুজায়েত ইসলাম বলেন, ‘পরিবহন মালিক বা শ্রমিক সংগঠনের নেতারা কখনো আমাদের কাছে অভিযোগ করেননি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নেবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে যত্রতত্র পার্কিং বন্ধ ও গণপরিবহন গুলোকে একই ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনা গেলে নগরে যানজট ও যাত্রী হয়রানি অনেকাংশেই কমে যাবে।

মন্তব্য করুন

comments