আমি নন্দিত নাগরিক নই,আমি একজন সাধারণ নাগরিক-মেয়র নাছির

83
শেয়ার
ছবিঃ আর্কাইভ

গতকাল শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত ‘নান্দনিক চট্টগ্রামে নন্দিত নাগরিক’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন সিনিয়র সাংবাদিকদের চট্টগ্রামের সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।সভায় সাংবাদিকেরা নগরের নানা সমস্যা তুলে ধরেন।চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি কলিম সারওয়ারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে ‘নন্দিত নাগরিক’হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মেয়র।

সেখানে তিনি বলেন, আমি এই নগরীর নন্দিত নাগরিক নই। আমি নিজেকে নন্দিত নাগরিক মনে করি না।আমি একজন সাধারণ নাগরিক। সাধারণ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে চাই।

যানজট প্রসঙ্গে আ জ ম নাছির বলেন, যানজট নিরসনের নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রথম দফায় এয়ারপোর্ট রোড সম্প্রসারণ করা হবে। তাছাড়া গণপরিবহন শৃঙ্খলায় আনা, যত্রতত্র যাত্রী উঠানামা না করা, লেন করাসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হবে।তিনি বলেন,যাত্রী তোলার জন্য প্রতিটি মোড়ে গণপরিবহনগুলো এলোমেলো, আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। নিজেদের মধ্যে আনহেলদি কম্পিটিশন করছে। এতে গাড়ির লাইন পড়ছে। হর্ণ দিলেও চুল পরিমাণ নড়ে না। এ অবস্থায় সব গণপরিবহন মালিকদের একই ম্যানেজমেন্টের আওতায় আনা হলে আনহেলদি কম্পিটিশন থাকবে না। চালক-শ্রমিকদের মজুরি, জ্বালানি, আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে ম্যানেজমেন্ট গণপরিবহন মালিকদের সিট অনুযায়ী লাভের অর্থ বণ্টন করতে পারে। পরিবহন মালিকদের আমরা এ প্রস্তাব দিয়েছি। এতে নগরবাসী উপকৃত হবে।

টানা ভারী বর্ষণে নগরের সড়কগুলো বেহাল হয়ে পড়েছে বলে স্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। তিনি বলেন, ভাঙা ও বেহাল সড়ক দ্রুত যান চলাচলের উপযোগী করে তুলতে সিটি করপোরেশন ঠিকাদার নিয়োগ করে রেখেছে। বৃষ্টি বন্ধ হলেই রাস্তার পিচঢালাইয়ের কাজ শুরু হবে। ডিসেম্বরে নগরে কোনো ভাঙা সড়ক দেখা যাবে না।

হকার প্রসঙ্গে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, নগরীর বিভিন্ন রাস্তায় হকারদের শৃঙ্খলায় নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে তাদেরকে প্রধান প্রধান সড়কের ফুটপাত থেকে সরিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে, যেখান তারা বিকেল পাঁচটা থেকে রা্ত ১১ টা পর্যন্ত পণ্য বিক্রি করতে পারবে্। এতে যত বাধাই আসুক গ্রাহ্য করা হবেনা।

তিনি বলেন, ২ সেপ্টেম্বর কোরবানির ছুটি শুরু হচ্ছে। এরপরই হকারদের রাস্তা ছেড়ে দিতে হবে। ফুটপাতের নির্দিষ্ট একটি অংশ রং দিয়ে মার্কিং করে দেব। সেখানে কাপড় বিছিয়ে হকাররা বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত পণ্যসামগ্রী বিক্রি করবেন। তাদের ছবিসহ আইডি কার্ড দেব। ইতিমধ্যে চসিকের ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে হকারদের জরিপ করেছি। ভিডিও করেছি। হকার সমিতি থেকে তালিকা নিয়েছি। কাউন্সেলিং করেছি। সব স্টিল স্ট্রাকচার তুলে ফেলা হবে। রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচতে আমরা অভিন্ন ছাতা দেব।

কর আদায় প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, দেশের সব সিটি কর্পোরেশন এক আইনে পরিচালিত হচ্ছে। হোল্ডিং ট্যাক্স বলা হলেও এর মধ্যে গৃহকর, পরিচ্ছন্ন রেইট, আলোকায়ন রেইট মিলে ১৭ শতাংশ নিচ্ছি। রিট খারিজ হওয়ায় কর নিয়ে আর বাধা নেই।

জলাবদ্ধতা সমস্যা নিয়ে মেয়র নাছির বলেন, প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যাসহ অন্য সমস্যাগুলোর বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন, সেই জন্য জলাবদ্ধতা নিরসনে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে। সিডিএ প্রকল্পগুলো সম্পন্ন করে সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করবে।

তিনি বলেন,জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রকল্পে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করব। আমাদের চিন্তার ভিন্নতা ও মতপার্থক্য থাকতে পারে। সবার উদ্দেশ্য জনগণের সেবা করা। আমরাও চাই সমন্বিত কার্যক্রম।

অপ্রশস্ত বিমানবন্দর সড়কটি আরও চওড়া করার কথা জানান মেয়র। তিনি বলেন, বিমানবন্দর সড়কে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও জ্বালানি তেল কোম্পানির জায়গা রয়েছে। এসব সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে। ইতিমধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষ জায়গা দিতে সম্মত হয়েছে। এটি হবে নগরের একটি নান্দনিক সড়ক।

আইনে নির্ধারিত তিনটি সেবার বাইরে সিটি করপোরেশনের আর কোনো দায়িত্ব নেই বলেও তিনি দাবি করেন।

মেয়র বলেন, দেশের সব সিটি করপোরেশন নির্দিষ্ট আইন দিয়ে পরিচালিত হয়। সেই আইন অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের কাজ মূলত তিনটি- রাস্তা ও নালা সংস্কার, আলোকায়ন এবং নগর পরিচ্ছন্ন রাখা।কিন্তু সিংহভাগ নগরবাসী ভুল ধারণা পোষণ করেন। তারা ভাবেন, সিটি এলাকার সামগ্রিক দিক দেখাশোনার দায়িত্ব শুধু সিটি করপোরেশনের। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, পরিবহন ও জলাবদ্ধতাসহ সবকিছুর জন্যই সরাসরি সিটি করপোরেশনকে দায়ী করেন তারা। কিন্তু সবগুলো বিষয় তত্ত্বাবধানের জন্য আলাদা আলাদা সংস্থা কাজ করে।

চট্টগ্রাম নগরীতে চলমান বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কারণে নগরবাসীর দুর্ভোগের বিষয়টি তুলে ধরে নাছির বলেন, “এসব কাজের জন্য অনুমতি চাইলে দিতে হয়। বিশেষ প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ওই রাস্তা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু সব দোষ পড়ে সিটি করপোরেশনের ওপর।”

উদাহরণ হিসেবে মেয়র বহদ্দারহাট থেকে শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত সড়কটি চার লেনে উন্নীত করার কাজের কথা বলেন। ২০১০ সাল থেকে এ প্রকল্পের কাজ শুরুর কথা থাকলেও তা শুরু হয়েছে কয়েক মাস আগে।

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির পেছনে নগরীর সড়কগুলো আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠান বা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন নাছির।
গত দুই বছরে নগরী থেকে বিলবোর্ড উচ্ছেদ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে ‘ডোর টু ডোর’ সার্ভিস চালুসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন তিনি।

এলইডি বাতির মাধ্যমে পুরো নগরীতে আলোকায়নের কাজ চলছে জানিয়ে মেয়র বলেন, “আমরা প্রতিনিয়ত নগরবাসীর জন্য কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।”

নগরবাসীর প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় দুঃখও প্রকাশ করেন মেয়র।

তিনি বলেন,“সেবামূলক কাজ হচ্ছে একটা টিমওয়ার্ক। এ কাজে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নাগরিকদেরও একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে সিটি করপোরেশনের উন্নয়নের ক্ষেত্রে।এ ব্যাপারে প্রতিনিয়ত মাইকিংসহ লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে নাগরিকদের সহায়তা কামনা করা হয়। কিন্তু সিটি করপোরেশন প্রত্যাশা অনুযায়ী সহযোগিতা পাচ্ছে না।”

চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব সভাপতি কলিম সরওয়ারের সভাপতিত্বে, সাধারণ সম্পাদক শুকলাল দাশের সঞ্চালনায় অন্যদের মধ্যে প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও রূপালী ব্যাংকের পরিচালক আবু সুফিয়ান, প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আলী আব্বাস, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, চট্টগ্রাম সাংবাদিক হাউজিং কো-অপারেটিভ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক হাসান ফেরদৌস, প্রেসক্লাবের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি কাজী আবুল মনসুর ও যুগ্ম-সম্পাদক চৌধুরী ফরিদ বক্তব্য দেন ।

এছাড়া প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মহসিন চৌধুরী, স্থায়ী সদস্য সমীর কান্তি বড়ুয়া, নুরুল আলম, নাজিমুদ্দিন শ্যামল, একরামুল হক বুলবুল, সৈয়দ আবদুল ওয়াজেদ ও মুস্তফা নঈমও আলোচনায় অংশ নেন।

মন্তব্য করুন

comments