চট্টগ্রাম নগরী যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো এক শহর সড়কের গর্তগুলো পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে

1482
শেয়ার
ছবিঃ সংগৃহিত

টানা বর্ষণ, জলাবদ্ধতা আর অবিরাম খোঁড়াখুঁড়িতে চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রায় ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি সড়ক জুড়ে বড় বড় গর্ত গুলো যেন মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়েছে।এছাড়া বিভিন্ন সংস্থা কোন ধরনের সমন্বয় ছাড়াই এসব সড়ক সংস্কারের নামে  চট্টগ্রাম নগর জুড়ে দুর্ভোগ শুধু বাড়িয়েই তুলছে।

চার দিন আগে গত রোববার নগরীর নিমতলা এলাকায় ভাঙা রাস্তার কারণে কন্টেইনারবাহী একটি ট্রেলার উল্টে অটোরিকশার চালকসহ তিনজন নিহত হন।

ছবিঃ সংগৃহিত

ট্রেলার ও অটোরিকশা দুটোই নিমতলা মোড়ের দিকে যাচ্ছিল। এক পর্যায়ে রাস্তায় সৃস্টি হওয়া গর্তের মধ্যে চাকা পড়ে ট্রেলারটি উল্টে গিয়ে অটোরিকশাটিকে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়।

গত মঙ্গলবারও নগরীর দুই নম্বর গেইট এলাকায় গর্তে চাকা পড়ে একটি ট্রাক উল্টে গেলে কয়েকজন রিক্সা আরোহী অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান। চট্টগ্রাম নগর জুড়ে এমন অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন।

চট্টগ্রামের ৮৬১ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৩৬৭ কিলোমিটারেরই করুন দশা।সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) অধীন চট্টগ্রাম জেলায় মোট ৩৬৭ কিমি পাকা সড়কের মধ্যে ২৫০, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (সিসিসি) এলাকায় ৪২৮ কিমির মধ্যে ১০০ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৬৬ কিমির চট্টগ্রাম অংশে ১৭ কিলোমিটার সড়কের অবস্থা বেশি খারাপ বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাষ্য।

এছাড়াও নগরীর কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত আরাকান সড়ক, জাকির হোসেন রোড, বহদ্দারহাট থেকে তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু পর্যন্ত সড়ক, সিডিএ এভিনিউর অংশ বিশেষ, পোর্ট কানেকটিং রোড, কাপাসগোলা, হালিশহর সিডিএ আবাসিক এলাকার সড়ক, সিরাজদ্দৌলা সড়ক, চৌমুহনী থেকে আগ্রাবাদ এক্সেস সংযোগ সড়ক, এনায়েত বাজার থেকে মোমিন রোড, বাকলিয়া এলাকার বিভিন্ন সড়কে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

কোথাও কোথাও এসব গর্ত বিশাল আকার ধারণ করেছে ।এসব এলাকায় গর্তের সাথে যোগ হয়েছে সড়কের উঁচু-নিচু অংশ।ফলে অনেক সড়কের একপাশের অংশ উঁচু হয়ে আছে। রাস্তার মাঝের অংশ পাশের অংশের তুলনায় নিচু।প্রতিদিন এসব গর্তে আটকা পড়ছে গাড়ি। যানজটের পাশাপাশি ঘটছে দুর্ঘটনাও।সবকিছু মিলিয়ে পুরো চট্টগ্রামই যেন পরিণত হয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি শহরে।

এর পাশাপাশি যানবাহন চলাচলেও প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছে চালকরা। বেশীর ভাগ সময় লেগে থাকছে যানজটও। বৃষ্টি না থামায় সড়ক মেরামতেও নামতে পারছে না চট্টগ্রাম সিটি করপোরশেন ও সড়ক ও জনপথ বিভাগ। ফলে সহসা ভোগান্তি কমছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাছাড়া ভাঙ্গা রাস্তার কারণে আগ্রাবাদ এক্সেস সড়কটিতে যানবাহন চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। এই সড়ক দিয়ে বিভিন্ন ধরণের যানবাহন অত্যন্ত মন্থর গতিতে চলাচল করছে। বৃষ্টির সাথে জলাবদ্ধতা এই সড়কটির জন্য মরার উপর খরার ঘা হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে মুরাদপুর থেকে অক্সিজেন মোড়, বালুছড়া, বড় দীঘির পাড়, চৌধুরীহাট, নন্দিরহাট এবং হাটহাজারী বাস স্ট্যান্ড এলাকায় ভাঙা সড়ক বেশি। হাটহাজারী থেকে রামগড় সড়কের মীরের হাট, নাজিরহাট বাস স্ট্যান্ড, ভুজপুর বৈদ্যেরহাট বাজার, কাজীরহাট ও নারায়ণ হাট-হেয়াঁকো এলকার সড়কও ভাঙা। এ সড়ক দিয়েই চলাচল করে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িগামী যানবাহন।

বহদ্দারহাট থেকে কাপ্তাই রাস্তার মাথা সড়কটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। প্রতিদিন লাখ লাখ যাত্রী এই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দিয়ে চলাচল করে। বিশেষ করে বহদ্দারহাট মোড় থেকে বাস টার্মিনাল, পুরাতন চান্দগাঁও, সিঅ্যান্ডবি মোড়ের সড়কটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।

এই সড়কটিতে শতাধিক ছোট বড় গর্ত রয়েছে। খানাখন্দের সাথে যোগ হয়েছে কর্দমাক্ত রাস্তা, আবার কোথাও ধুলোবালি যাত্রী সাধারণকে দারুণ দুর্ভোগে ফেলছে। পরিবহনে চড়তে গিয়ে যাত্রীদের বড় ধরণের ঝাঁকুনি খেতে হচ্ছে। এছাড়া এই সড়কে ছোট বড় বিভিন্ন ধরণের যানবাহন চলছে অত্যন্ত মন্থর গতিতে। এরমধ্যে গর্তে কোনো গাড়ি আটকে গেলে দ্রুত লম্বা লাইনের যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।

টার্মিনাল এলাকায় ইট বিছানো এবড়ো থেবড়ো ও খানাখন্দে ভরা রাস্তা ও সিটি পরিবহনসহ আন্তঃজেলার বিভিন্ন যানবাহনের উপস্থিতি দীর্ঘ সময় ধরে যানজট পরিস্থিতিতে ফেলছে।

বন্দর নগরীর বেশ কিছু প্রধান সড়ক ও অলিগলির পরিস্থিতি বেহাল হলেও শুধু বহদ্দারহাট থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত আরাকান সড়কের সংস্কার কাজ শুরু করেছে সিটি করপোরেশন। নগরীর অধিকাংশ সড়কের অবস্থা খারাপ হলেও সিসিসি এখনো সুনির্দিষ্ট করতে পারেনি। তবে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে রাস্তা খারাপ হওয়ার হিসাব ধরে খারাপ সড়কের আনুমানিক হিসাব করেছে সিসিসি। সিসিসি’র হিসাবে নগরীতে পাকা সড়ক ৪২৮ কিলোমিটার। নতুন করে কাজ করা অধিকাংশ সড়কেরই কার্পেটিং উঠে গেছে।

যানজট,ভাঙা সড়ক, ছোট বড় গর্তের কারণে নগরীতে বর্তমানে ৫ মিনিটের রাস্তা পার হতে সময় লাগে ৩০ মিনিট।এ নিয়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রায় প্রতিদিনই প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও তেমন কোন উদ্যোগ দেখা যায়নি এ পর্যন্ত।

বর্তমানে নগরীতে পিচঢালা ১ হাজার ১৪০টি সড়ক আছে। যার দৈর্ঘ্য ৬২০ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ৭ দশমিক ২০ মিটার।

সিসিসি’র নির্বাহী প্রকৌশলী (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মনিরুল হুদা জানান, প্রতিবছর নিজস্ব বরাদ্দ থেকেই সিসিসি ১০০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার করে। বিশেষ কোনো বরাদ্দ না পেলে এবারো তাই করা হবে। গত সপ্তাহে নিজস্ব তহবিল থেকে আরাকান সড়কের সংস্কার কাজ শুরু করেছে সিসিসি।

বৃষ্টি কমে গেলে কার্পেটিং এর কাজ হবে জানিয়ে সিটি করপোরেশন প্রকৌশলী মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড ও পোর্ট কানেক্টিং রোড নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে টেন্ডার হয়ে গেছে। জাইকার অর্থায়নে এই সড়ক দুটি নির্মিত হবে। সড়কের পাশে সৌন্দর্যবর্ধন করা হবে। বর্ষা চলে গেলে এই নির্মাণ কাজ শুরু হবে। এছাড়া অন্যান্য সড়কেও কার্পেটিং এর কাজ হবে।

প্রশ্নের জবাবে সিটি করপোরেশনের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘অনেকেই মনে করেন, নগরীর সবগুলো রাস্তা মেরামতের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। আসলে তা না। যেমন সিডিএ কর্তৃক যে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানকার পাশ্ববর্তী ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো মেরামতের দায়িত্ব সিডিএর। সড়ক ও জনপদের সড়কও রয়েছে নগরে।’

চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, ‘সিটি কর্পোরেশন সর্বাত্মক চেষ্টা করছে নগরীর ক্ষতিগ্রস্ত সড়কসমূহ দ্রুত সময়ের মধ্যে সংস্কার করে যানবাহন চলাচলের উপযোগি করতে। এর জন্য মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সিটি কর্পোরেশনও নিজস্ব তহবিল থেকে দিন রাত ২৪ ঘন্টা কাজ করে সড়ক সংস্কার করে যাচ্ছে।’

মন্তব্য করুন

comments